• জাতীয়
  • ঋতুচক্রের খামখেয়ালিপনা নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত? বসন্তের আকাশে ‘আষাঢ়ে’ বৃষ্টির নেপথ্যে যা বলছে বিজ্ঞান

ঋতুচক্রের খামখেয়ালিপনা নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত? বসন্তের আকাশে ‘আষাঢ়ে’ বৃষ্টির নেপথ্যে যা বলছে বিজ্ঞান

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
 ঋতুচক্রের খামখেয়ালিপনা নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত? বসন্তের আকাশে ‘আষাঢ়ে’ বৃষ্টির নেপথ্যে যা বলছে বিজ্ঞান

বঙ্গোপসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা আর ‘সুপার লা-নিনা’র প্রভাবে টালমাটাল আবহাওয়া; শিলাবৃষ্টি ও বজ্রঝড়ে বিপন্ন ফসলের মাঠ, শঙ্কায় বাংলার কৃষক।

ঋতুরাজ বসন্তের ফুরফুরে হাওয়ার বদলে প্রকৃতিতে এখন শ্রাবণের ধারা। ক্যালেন্ডারের পাতায় চৈত্র মাস চললেও প্রকৃতির আচরণ বলছে অন্য কথা। কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে যে ঘন মেঘ আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে, তা যেন আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষাকেও হার মানায়। চৈত্র মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টির ধরন ছাপিয়ে এবারের টানা ভারী বর্ষণ আর দানবীয় শিলাবৃষ্টি সাধারণ মানুষকে শুধু অবাকই করেনি, ভাবিয়ে তুলেছে আবহাওয়াবিদদেরও। প্রশ্ন উঠেছে—প্রকৃতি কি তবে তার চিরচেনা রূপ বদলে এক নতুন ও চরম ভাবাপন্ন যুগে প্রবেশ করছে?

কেন এই অকাল বর্ষণ? যা বলছে বৈশ্বিক গবেষণা

আবহাওয়াবিদ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃতির এই আকস্মিক পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বা Global Warming-এর একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। সাধারণত চৈত্রের শেষে কালবৈশাখীর দেখা মিললেও এবার ফাল্গুন থেকেই শুরু হয়েছে বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (C3S) এবং আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা অ্যাকু ওয়েদার (AccuWeather)-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে এক অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা Atmospheric Instability বিরাজ করছে। নাসার (NASA) পাঠানো Satellite Imagery থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প তৈরি করছে, যা স্থলভাগের শীতল বাতাসের সংস্পর্শে এসে শক্তিশালী ‘বজ্রমেঘ’ তৈরি করছে। এই মেঘের উচ্চতা এবার অনেক ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে, যা তীব্র শিলাবৃষ্টি বা Hailstorm-এর প্রধান কারণ।

‘সুপার লা-নিনা’ ও বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতা

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালটি একটি ‘সুপার লা-নিনা’ (Super La Niña) বছর হতে যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই বিশেষ শীতল অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুকে সময়ের অনেক আগেই সক্রিয় করে তুলছে। এর ফলে বর্ষা আসার আগেই ভারী বর্ষণের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এই অস্থিরতাকে গাণিতিকভাবে পরিমাপ করা হয় ‘কনভেক্টিভ অ্যাভেইলেবল পটেনশিয়াল এনার্জি’ (CAPE) দ্বারা। বর্তমানে এই কেপ-এর মান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনে আরও বড় ধরনের Thunderstorm বা বজ্রঝড়ের ঝুঁকি রয়েছে।

মাঠের ফসলে প্রকৃতির আঘাত: শঙ্কায় কৃষক

অকাল এই বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি কেবল জনজীবনই বিপর্যস্ত করেনি, দেশের কৃষি অর্থনীতির ওপরও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। চৈত্র মাস হলো বোরো ধানের থোড় আসার চূড়ান্ত সময়। এই মুহূর্তে শিলাবৃষ্টি মানেই ফসলের অপূরণীয় ক্ষতি। এছাড়া আম ও লিচুর মুকুল এই ভারী বৃষ্টিতে ঝরে পড়ছে, যা সরাসরি Market Value এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় প্রভাব ফেলবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ জানান, গত ১৮ মার্চ থেকে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় যে প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হয়েছে, তাতে বড় পাতার সবজিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে আমের মটর দানা আকৃতির গুটিগুলো ঝরে যাওয়ায় ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বোরো ধান এখনো ছোট থাকায় কিছু ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি উপকার করলেও নিচু জমিতে জলাবদ্ধতা বা Waterlogging নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস: আরও কতদিন এই মেঘ-বৃষ্টির খেলা?

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্প এবং ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা শুষ্ক বাতাসের সংমিশ্রণে তৈরি এই অস্থিরতা এখনই কাটছে না। চলমান এই বৃষ্টির ধারা আগামী ২৪ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ২১ মার্চের পর তীব্রতা কিছুটা কমলেও আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বিশেষ করে দুপুরের পর বা বিকেলের দিকে আকস্মিক বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ডব্লিউএমও-র মতে, এপ্রিল ও মে মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি হতে পারে। এর অর্থ হলো, মূল বর্ষা আসার আগেই দেশজুড়ে আগাম বন্যা বা Flash Flood-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও হাওর এলাকায়।

উপসংহার

ঋতুচক্রের এই আগাম বদল মূলত প্রকৃতির এক মৌন প্রতিবাদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুগুলো তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এই পরিবর্তন কেবল আজ ও আগামীকালের বৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত সংকটের ইঙ্গিত। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় কৃষিখাতকে রক্ষা করতে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও Climate Adaptation বা জলবায়ু অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

Tags: climate change weather forecast weather update global warming agriculture news bangladesh rain shila brishti nasa satellite boro rice mango production