চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের বীরত্বগাঁথাকে রাষ্ট্রীয় দলিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের বীররা এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি (State Recognition) প্রদান করেই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। অবিলম্বে ‘জুলাই সনদ’ পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি।
সোমবার (২৩ মার্চ) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে’ শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে আয়োজিত এক আবেগঘন মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফ্যাসিবাদ ও মাফিয়াতন্ত্রের ১৬ বছর
বিগত সরকারের সমালোচনা করে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, “আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা দীর্ঘ ১৬ বছর দেশ ও জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। ২০০৮ সালে একটি সাজানো ও সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে মাফিয়াতন্ত্র ক্ষমতায় এসে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তছনছ করে দেয়। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ‘কেয়ারটেকার সরকার’ (Caretaker Government) পদ্ধতি বাতিল করে তারা দেশকে এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকে দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে অপশাসন চালানো হয়েছিল। এই দুঃশাসন থেকে জাতিকে মুক্ত করতে জুলাই বিপ্লবের বীররা তাদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় স্বাধীনতা ও বীরদের আত্মত্যাগ
সেলিম উদ্দিন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, জুলাই যোদ্ধারা লড়াই করে জাতিকে দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছেন। তবে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক বিশাল ত্যাগের মহিমা। প্রায় ২ হাজার তরতাজা প্রাণের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে। হাজার হাজার তরুণ আজ পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের এই আত্মত্যাগের যথার্থ মূল্যায়ন না হলে জাতি হিসেবে আমরা কলঙ্কিত থেকে যাব।
শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে জামায়াত
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে গৃহীত মানবিক উদ্যোগের বিবরণ দিয়ে মহানগরী আমীর বলেন, “আমরা জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করছি। জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রতিটি শহীদ পরিবারকে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি। এছাড়া আহতদের সুচিকিৎসার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সাপোর্ট (Medical Support) দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, জামায়াতই প্রথম শহীদদের সংক্ষিপ্ত জীবনীসহ একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের বীরদের বীরত্বগাঁথা তুলে ধরা এবং ইতিহাসের সঠিক আর্কাইভ (Archive) তৈরি করা।
সরকারের প্রতি বিশেষ আহ্বান
মতবিনিময় সভায় জামায়াত নেতা মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল মৌখিক স্বীকৃতি নয়, বরং প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে শহীদদের পরিবারকে পুনর্বাসন এবং আহতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
উক্ত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, জামাল উদ্দিন এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ। সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের হারানো স্বজনদের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।