• জাতীয়
  • এখনই ধনী দেশ হতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ

এখনই ধনী দেশ হতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
এখনই ধনী দেশ হতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ যেন হঠাৎ করেই একটু থেমে যেতে চাইছে।

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানব উন্নয়ন সূচকে ধারাবাহিক উন্নতির স্বীকৃতি হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি যখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই সরকার সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ এখনই সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়— এমনই একটি বার্তা মিলছে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ থেকে।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের তালিকা থেকে এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণ হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। তবে সরকার চায় এই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হোক। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে।

এলডিসি উত্তরণের পথে বাংলাদেশের অগ্রগতি

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি করে আসছে। এগুলো হলো— মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক।

২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ এই তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। এরপর ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের অনুমোদন দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় শেষে ২০২৬ সালের নভেম্বরেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার কথা।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে জাতিসংঘে জমা দেওয়া ‘পারফরম্যান্স অব ইকোনমি অ্যান্ড প্রিপারেশনস ফর সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন ফ্রম এলডিসি স্টাটাস ডিউরিং দ্য প্রিপারেটরি পিরিয়ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ এখনও এই তিনটি সূচকের মানদণ্ড পূরণ করছে এবং উত্তরণের পথেই রয়েছে। একইসঙ্গে এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ বাস্তবায়নের অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে— উত্তরণের প্রস্তুতিতে এখনও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

কেন সময় বাড়ানোর আবেদন

সরকারের পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর প্রধান যুক্তি হলো— এলডিসি উত্তরণের জন্য দেওয়া পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর সিই করা একটি চিঠি গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে প্রস্তুতিমূলক সময়ের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংকট মোকাবিলায়।

সরকারের ভাষায়, “উত্তরণের জন্য যে প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিল, তা মূলত সংকট ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং টিকে থাকার লড়াইয়েই কেটে গেছে।”

বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব

সরকার চিঠিতে একাধিক বৈশ্বিক কারণ তুলে ধরেছে, যেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে— কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও খাদ্য সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে কঠোরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি। এই পরিস্থিতির ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।

অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে— ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ। এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে বলে সরকারের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া, কর-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ।

এছাড়া কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় শিল্প খাতেও প্রভাব পড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়েছে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রগতিও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাধ্য হয়ে নীতিনির্ধারণের মূল ফোকাস উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে সরে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে চলে গেছে।

বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা

এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ কিছু বিশেষ সুবিধা হারাবে— এমন আশঙ্কাও সরকারের বিবেচনায় এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষ ও পৃথক আচরণ সুবিধা, বিভিন্ন উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থার অগ্রাধিকার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে এসব সুবিধা হারালে রফতানি প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক নীতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

Tags: এখনই ধনী দেশ