বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও চাপে ফেলবে।
এতে আমদানির ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ মাসে নেমে আসতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। জেডসিএ-এর মূল্যায়নের বরাতে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার বর্ধিত এই দাম যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে তা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে। আমদানি ব্যয় বাড়লে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে।
এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি ঋণের সুদহার বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি হবে। বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ‘এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কাই এর প্রমাণ। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে দেরির কারণেই বাংলাদেশকে এই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। ’ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৪৬ শতাংশই মেটানো হয়েছিল আমদানি থেকে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতের জ্বালানির ৬৫ শতাংশ ছিল আমদানিনির্ভর।
জেডসিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আমদানিকৃত এই জ্বালানির বড় অংশই আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ওই পথে জাহাজ চলাচল এখন বিঘ্নিত হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে আরামকোর এক লাখ টন জ্বালানিবাহী একটি কার্গো উপসাগরীয় এলাকায় আটকে আছে।
সৌদি আরামকো ও আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতিবছর এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ।
এলএনজির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা পুরো বিদ্যুৎ খাতেই আর্থিক সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে দেশের ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বন্ধ।’
এই জ্বালানিসংকটে পঙ্গু হচ্ছে দেশীয় শিল্প খাতও। ইতিমধ্যে চারটি সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পও। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দিনে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ব্যাকআপ জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না।’
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের মোট জ্বালানির মাত্র ২ শতাংশ এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। ২০২৪ সালেও এর তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৪১টি নতুন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এতে বর্তমান সক্ষমতার তিন গুণ বা ৩৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যার প্রায় পুরোটাই হবে এলএনজিনির্ভর।