চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)। সরকারের নির্ধারিত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এই সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। যদিও বছর ব্যবধানে রাজস্ব আদায়ে ১২.৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি (Growth) বজায় রয়েছে, তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিপুল ঘাটতির মুখে তিন প্রধান খাত বুধবার (২৫ মার্চ) এনবিআর কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে এনবিআর আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, আমদানি শুল্ক (Import Duty), মূল্য সংযোজন কর (VAT) এবং আয়কর (Income Tax)—রাজস্বের এই প্রধান তিন খাতের কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
খাতভিত্তিক আদায়ের চিত্র: ১. আয়কর খাতে সর্বোচ্চ ধস: চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে। এই খাতে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কেবল আয়কর থেকেই ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।
২. ভ্যাট বা মূসক আদায়ের অবস্থা: অভ্যন্তরীণ ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল এই খাতে ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৩ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ছিল। তবে এনবিআর আদায় করেছে ৯৭ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এ খাতে ২০ হাজার ৯৩২ কোটি টাকার ঘাটতি রয়ে গেছে।
৩. আমদানি শুল্ক ও কাস্টমস: আমদানি বা শুল্ক খাতে ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।
প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ও ফেব্রুয়ারির চিত্র রাজস্ব আদায়ে বড় অংকের ঘাটতি থাকলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এনবিআর কিছুটা এগিয়ে আছে। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আদায় হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, যার বিপরীতে এবার ১২.৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
তবে একক মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারির চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে ৪২ হাজার ৫১ কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই ঘাটতি ১১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। তবে এ মাসেও বছর ব্যবধানে ৮.১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে ডলার সংকট ও আমদানিতে কড়াকড়ির কারণে কাস্টমস থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব মিলছে না। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ভ্যাট ও আয়কর আহরণেও স্থবিরতা কাজ করছে। অর্থবছরের বাকি সময়গুলোতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে এনবিআর-কে কর জাল (Tax Net) সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে হতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।