• বিনোদন
  • সুরলোকে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর সেই কণ্ঠ: একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি মাহবুবা রহমানের প্রয়াণ

সুরলোকে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর সেই কণ্ঠ: একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি মাহবুবা রহমানের প্রয়াণ

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
সুরলোকে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর সেই কণ্ঠ: একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি মাহবুবা রহমানের প্রয়াণ

বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের কালজয়ী গায়িকা এবং রেডিও-চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম কাণ্ডারি মাহবুবা রহমান ৮৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

নিভে গেল বাংলাদেশের সংগীতাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কালজয়ী গায়িকা এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই গুণী শিল্পী।

ঐতিহাসিক ‘মুখ ও মুখোশ’ ও মাহবুবা রহমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাহবুবা রহমানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ সমর দাসের সুরে তার গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। মূলত এই একটি গানের মাধ্যমেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র সংগীতের ধারায় নতুন এক মাত্রা যোগ করেছিলেন।

রেডিও থেকে রূপালি পর্দা: এক দীর্ঘ পথচলা মাহবুবা রহমানের সংগীত জীবনের শুরুটা হয়েছিল দেশভাগের ঠিক আগমুহূর্তে। ১৯৪৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার তার গান ব্রডকাস্ট (Broadcast) করা হয়। পঞ্চাশ ও সত্তর দশকের রেডিও এবং চলচ্চিত্রের অসংখ্য কালজয়ী গানের নেপথ্য কারিগর ছিলেন তিনি। মূলত পল্লিগীতি ও আধুনিক গানের এই শিল্পী তার স্বতন্ত্র গায়কী ও ভরাট কণ্ঠের জন্য দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

‘মুখ ও মুখোশ’-এর সাফল্যের পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘আসিয়া’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘কখনো আসেনি’, ‘সূর্যস্নান’, ‘সোনার কাজল’, ‘রাজা সন্ত্রাসী’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ও ‘সাত ভাই চম্পা’-র মতো কালজয়ী সব চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক (Playback) করেছেন তিনি। বিশেষ করে জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ ছবিতে খান আতাউর রহমানের সুরে তার গাওয়া ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম রোমান্টিক ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও উত্তরাধিকার ব্যক্তিজীবনে মাহবুবা রহমান ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ১৯৫০ সালে আবুল হাসনাতের সঙ্গে তার প্রথম বিয়ে হলেও তা স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা ও সংগীতজ্ঞ খান আতাউর রহমানের সঙ্গে তার পরিণয় ঘটে। এই শিল্পী দম্পতির ঘরে জন্ম নেন বর্তমান প্রজন্মের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলামসহ দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মাহবুবা রহমানের বড় ছেলে মারুফ ইতোমধ্যে পরলোকগমন করেছেন এবং ছোট ছেলে বাবন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

জাতীয় সম্মান ও শেষ বিদায় সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। তার মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সংগীত জগতের প্রথিতযশা শিল্পী ও কলাকুশলীরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মাহবুবা রহমানের প্রয়াণের মাধ্যমে বাংলা গানের একটি সমৃদ্ধ অধ্যায়ের অবসান ঘটল, যা অপূরণীয়।

জাতীয় পর্যায়ের এই কণ্ঠশিল্পীর মহাপ্রয়াণ কেবল একটি শূন্যতাই নয়, বরং বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসের একটি লিগ্যাসি (Legacy)-র সমাপ্তি। তার গাওয়া সুরগুলো আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হবে যুগ যুগ ধরে।

Tags: playback singer bangladeshi singer music legend obituary news ekushey padak mahbuba rahman mukh o mukhosh khan ataur rahman radio artist dhaka music