• ব্যবসায়
  • একই গাছে ভোজ্যতেল ও জ্বালানি: সাতক্ষীরায় সূর্যমুখী বিপ্লবে হলুদ গালিচায় ছেয়ে গেছে দিগন্ত

একই গাছে ভোজ্যতেল ও জ্বালানি: সাতক্ষীরায় সূর্যমুখী বিপ্লবে হলুদ গালিচায় ছেয়ে গেছে দিগন্ত

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
একই গাছে ভোজ্যতেল ও জ্বালানি: সাতক্ষীরায় সূর্যমুখী বিপ্লবে হলুদ গালিচায় ছেয়ে গেছে দিগন্ত

লবণাক্ত মাটিতেও মিলছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য; মাত্র এক বছরেই চাষ বেড়েছে দ্বিগুণ। তেলের পাশাপাশি জ্বালানির চাহিদা মেটাতে উপকূলীয় কৃষকদের নতুন ভরসা এই সোনালি ফসল।

সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন কেবলই হলুদের আভা। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই বড় বড় থালার মতো সূর্যমুখী ফুল বাতাসের দোলায় দুলছে। একসময় যে নোনা মাটিতে অন্য ফসল ফলাতে হিমশিম খেতেন কৃষকরা, আজ সেখানেই বিপ্লব ঘটাচ্ছে সূর্যমুখী। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জেলাটিতে এই তৈলবীজ চাষের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণ। একই গাছ থেকে উচ্চমানের ভোজ্যতেল এবং রান্নার জ্বালানি—উভয় সুবিধা মেলায় উপকূলীয় কৃষকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ।

লবণাক্ত অঞ্চলে সূর্যমুখীর জয়জয়কার সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলাতেই এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে সূর্যমুখীর আবাদ। বিশেষ করে জেলার উপকূলীয় ও অধিক লবণাক্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে উচ্চফলনশীল (High Yielding) জাতের সূর্যমুখী চাষে ঈর্ষণীয় সাফল্য মিলেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও মাটির লবণাক্ততা সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতা থাকায় এই ফসলটি কৃষকদের কাছে ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (DAE) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলাটিতে মাত্র ১০৭ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছিল। কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহ এবং লাভজনক হওয়ার কারণে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৮ হেক্টরে। অর্থাৎ, চাষের পরিধি এক বছরের ব্যবধানে শতভাগেরও বেশি বেড়েছে।

এক গাছে দুই সুবিধা: তেল ও জ্বালানি সূর্যমুখী চাষের প্রতি কৃষকদের বাড়তি আকর্ষণের প্রধান কারণ এর বহুমুখী ব্যবহার। কৃষকরা জানিয়েছেন, কম উৎপাদন খরচে (Production Cost) এখান থেকে যেমন খাঁটি ভোজ্যতেল পাওয়া যায়, তেমনি ফলন সংগ্রহের পর গাছের অবশিষ্ট অংশ শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি বা খড়ি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বর্তমান বাজারে ভোজ্যতেলের চড়া দাম এবং গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সূর্যমুখী চাষ তাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

হলুদ গালিচায় পর্যটনের ছোঁয়া সূর্যমুখী কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই আনছে না, বরং জেলাজুড়ে তৈরি করেছে এক নান্দনিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ মাঠের এই হলুদ গালিচা এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। প্রতিদিন বিকেলে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন সূর্যমুখী ক্ষেতে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ক্ষেতে সেলফি (Selfie) তোলার প্রবণতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জেলাটিকে নতুনভাবে পরিচিত করছে।

কৃষকদের দাবি ও সরকারি আশ্বাস মাঠে ফলন ভালো হলেও চাষ আরও সম্প্রসারণের জন্য সরকারি সহযোগিতা চেয়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের দাবি, বিনামূল্যে সার (Fertilizer) ও মানসম্মত কীটনাশক (Pesticide) সরবরাহ করা হলে আগামীতে সূর্যমুখীর আবাদ আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে। এটি কেবল কৃষকের আয়ই বাড়াবে না, বরং দেশের ভোজ্যতেলের বিশাল আমদানিনির্ভরতা কমাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, "সাতক্ষীরার লবণাক্ত মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা কৃষকদের কারিগরি সহযোগিতা এবং নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। তেল ফসল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং মাটির গুণাগুণ রক্ষায় সূর্যমুখী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অচিরেই সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী জোন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।"

প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং বাজারমূল্য ভালো হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে সাতক্ষীরার কৃষি অর্থনীতিতে সূর্যমুখী একটি শক্তিশালী ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

Tags: coastal agriculture satkhira news farmer success sunflower cultivation edible oil saline soil dae update high yielding fuel source oil seed