আধুনিক ক্রিকেটে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলা আর বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের (Franchise League) ঝনঝনানির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা। আসন্ন বাংলাদেশ সিরিজের জন্য ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট ‘দ্য হান্ড্রেড’ (The Hundred)-এর মোটা অঙ্কের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন প্যাট কামিন্সসহ অজিদের মূল বহরের বেশ কয়েকজন তারকা ক্রিকেটার।
আর্থিক প্রলোভন বনাম জাতীয় গৌরব ক্রিকেটের বর্তমান বাজারমূল্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর দাপট আকাশচুম্বী। মাত্র কয়েক দিনের ক্রিকেটের বিনিময়ে খেলোয়াড়দের সামনে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার চেক। অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে ও টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্স সম্প্রতি ‘বিজনেস অব স্পোর্ট’ (Business of Sport) নামক একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে প্রকাশ করেছেন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিনি জানান, বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ (Test Series) খেলার জন্য তার দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ‘দ্য হান্ড্রেড’ টুর্নামেন্টের ৫ লক্ষ পাউন্ড বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কামিন্সের ভাষায়, “আমাদের ক্রিকেটাররা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার ব্যাপারে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এটি তারই প্রমাণ। মাত্র ২০ দিনের লিগ খেলে ৮ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ তারা ছেড়ে দিচ্ছে কেবল জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলার তাগিদে। এটি নিঃসন্দেহে দারুণ একটি বিষয়।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে কামিন্সের সতর্কবার্তা খেলোয়াড়দের এই ত্যাগ কামিন্সকে গর্বিত করলেও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের টিকে থাকা নিয়ে তিনি কিছুটা শঙ্কিত। কামিন্স মনে করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের আর্থিক প্রলোভনের বিপরীতে জাতীয় দলের প্রতি এই আনুগত্য চিরকাল বজায় নাও থাকতে পারে। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে যে লড়াই শুরু হয়েছে, তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের ক্রিকেটাররা এখন দেশের হয়ে খেলতে উন্মুখ, কিন্তু আমাদের ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে এই পরিস্থিতি আজীবন অপরিবর্তিত থাকবে।”
প্যাট কামিন্স নিজেও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তিনি আমেরিকার ‘মেজর লিগ ক্রিকেট’ (Major League Cricket)-এর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেছেন। তবে দেশের স্বার্থ এবং ওয়ার্কলোড (Workload) ম্যানেজমেন্টের প্রশ্নে তিনি আপসহীন।
ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট ও টেস্ট ক্রিকেটের স্থায়িত্ব অস্ট্রেলিয়া দলে সাম্প্রতিক সময়ে সিনিয়র খেলোয়াড়দের ফরম্যাট পরিবর্তনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। মিচেল স্টার্ক টি-টোয়েন্টি থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছেন, ডেভিড ওয়ার্নার ইতোমধ্যে সাদা পোশাক তুলে রেখেছেন। তবে অধিনায়ক কামিন্স ভিন্ন পথে হাঁটতে চান। ৩২ বছর বয়সী এই পেসার অন্তত আরও চার-পাঁচ বছর তিন ফরম্যাটেই সমানতালে খেলে যেতে চান।
কামিন্স স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, টেস্ট ক্রিকেটের আভিজাত্য বজায় রাখাই তার অগ্রাধিকার। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের হাতছানি থাকলেও তিনি মনে করেন, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট জেতার তৃপ্তি অন্য কোনো লিগ দিতে পারবে না। বাংলাদেশ সফরের এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সিরিজ নয়, বরং আধুনিক ক্রিকেটে ‘কান্ট্রি বনাম ক্লাব’ দ্বন্দ্বে ঐতিহ্যের জয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার এই টেস্ট সিরিজটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (World Test Championship) অংশ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই ঢাকায় আসার পরিকল্পনা করছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।