• দেশজুড়ে
  • শরীরে ১৫০ বুলেটের ক্ষত, দেড় বছর ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় নীলফামারীর ‘জুলাই যোদ্ধা’ মুন

শরীরে ১৫০ বুলেটের ক্ষত, দেড় বছর ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় নীলফামারীর ‘জুলাই যোদ্ধা’ মুন

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
শরীরে ১৫০ বুলেটের ক্ষত, দেড় বছর ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় নীলফামারীর ‘জুলাই যোদ্ধা’ মুন

রংপুর পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ‘Advanced Surgery’; অভাবের সংসারে থমকে গেছে সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন।

২০২৪ সালের সেই উত্তাল ১৬ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল সারাদেশ। দুপুর ১টার দিকে রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠ যখন রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছিল, তখন মিছিলের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সপ্তম ব্যাচের মেধাবী ছাত্র মো. মাহবুর আল হাসান মুন। নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার পানিয়াল পুকুর পূর্বপাড়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা মুনের স্বপ্ন ছিল বড় ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। কিন্তু একটি দুপুর মুনের জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়, তার শরীরে এঁকে দেয় দেড় শতাধিক বুলেটের ক্ষত।

‘রক্তাক্ত ১৬ জুলাই’: মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মুন সেদিন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটে যখন ছাত্র-জনতার স্রোত আছড়ে পড়ে, তখন পুলিশি বাধার মুখে পড়ে আন্দোলনকারীরা। লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলের পর শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ। মিছিলের সামনের সারিতে থাকা মুনের শরীরে ঝাঁঝরা করে দেয় পুলিশের ছররা গুলি। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সহযোদ্ধারা তাকে মোটরসাইকেলে করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেন, মুনের শরীরে প্রায় ২০০টির মতো ‘Pellets’ বা ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছে।

শরীরজুড়ে ১৫০ ‘Pellets’: চিকিৎসকদের পরামর্শ ‘Advanced Treatment’ রংপুর মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শরীর থেকে প্রায় ৪০টি গুলি বের করা সম্ভব হলেও অবশিষ্ট রয়ে যায় আরও ১৫০টি। বর্তমানে মুনের মাথায় ৫টি এবং মুখে ১০টিসহ শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল জায়গায় এই বিষাক্ত সিসার গুলিগুলো বিদ্ধ হয়ে আছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এসব গুলি দীর্ঘসময় শরীরে থাকলে ‘Lead Poisoning’ বা স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাকে অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে ‘Foreign Medical Consultation’ বা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একজন প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে সেই ব্যয়ভার বহন করা একপ্রকার অসম্ভব।

গেজেটভুক্ত হয়েও মেলেনি উন্নত চিকিৎসার সুযোগ মুন ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘July Warrior Gazette’-এ তালিকাভুক্ত হয়েছেন (গেজেট নম্বর ৯৮৭, কেস আইডি ৩২৯০৪)। নিয়ম অনুযায়ী সরকারিভাবে তার সম্পূর্ণ চিকিৎসা সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেড় বছর পার হয়ে গেলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। মুন জানান, “সরকার থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছি, কিন্তু তা দিয়ে এই জটিল ‘Surgery’ সম্ভব নয়। আমি গরিবের সন্তান, আমার বাবা সব বিক্রি করে আমার পেছনে খরচ করেছেন। এখন আমরা নিঃস্ব।”

অভাবের কাছে হার মানছে স্বপ্ন মুনের বাবা আব্দুল খালেক একজন সাধারণ কৃষক, যার দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল ছোট ছেলেকে নিয়ে। আজ ছেলের এই অবস্থা দেখে তিনি বাকরুদ্ধ। মুনের মা মুন্নী বেগম বলেন, “ছেলেটা আমার সারা রাত ঘুমাতে পারে না। মাথা ব্যথায় চিৎকার করে। পড়ার টেবিলে বসলে শরীর জ্বালাপোড়া করে। মা হিসেবে এই দৃশ্য দেখা যে কত কষ্টের, তা বলে বোঝাতে পারব না। আমি সরকারের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করি, আমার ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিন।”

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) তানজিমা আঞ্জুম সোহানিয়া এ বিষয়ে বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সরকারিভাবে কী ধরনের বিশেষ সহায়তা দেওয়া যায়, আমরা সেটি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। তার উন্নত চিকিৎসার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।”

মুনের মতো হাজারো শিক্ষার্থীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’ টাকার অভাবে সুচিকিৎসা পাবেন না—এমনটা প্রত্যাশা করে না সচেতন সমাজ। মুনের চোখে এখন কেবল একটাই আকুতি, শরীর থেকে বিষাক্ত সিসার বোঝা নামিয়ে আবার যেন তিনি ফিরতে পারেন পলিটেকনিকের প্রিয় ক্লাসরুমে।

Tags: health update bangladesh news july uprising student protest injury news nilphamari news medical crisis student warrior pellet wounds government gazette