সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত ট্র্যাজেডিতে রূপ নিল। গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের অদূরে একটি রাবার নৌকায় করে লিবিয়া থেকে রওনা হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা চরম মানবিক সংকটে পড়েন। টানা ছয় দিন সাগরে খাবার ও পানীয় ছাড়া ভেসে থাকার পর ২২ জনের মৃত্যু হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের সলিল সমাধি নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, মৃত ২২ জনের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন, দিরাই উপজেলার ৪ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন রয়েছেন। নিহতরা পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে জমিজমা বিক্রি করে দালালদের মাধ্যমে ১২-১৩ লাখ টাকা খরচ করে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছিলেন। জগন্নাথপুরের নিহতরা হলেন— আমিনুর রহমান, শায়ক মিয়া, মো. আলী, মো. সোহানুর রহমান ও মো. নাঈম। দিরাইয়ের নিহতরা হলেন— নুরুজ্জামান সর্দার ময়না, সাহান এহিয়া, সাজিদুর রহমান ও মুজিবুর রহমান। এছাড়া দোয়ারাবাজারের ফাহিম নামে এক যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বেঁচে ফেরা পর্যটকদের বয়ান ও উদ্ধার অভিযান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী ‘ফ্রন্টেক্স’ সমুদ্র থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশী এবং বাকিরা দক্ষিণ সুদান ও শাদের নাগরিক। জীবিতরা জানান, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে তারা রওনা হয়েছিলেন। সাগরে দিকভ্রান্ত হয়ে এবং বৈরি আবহাওয়ার মুখে পড়ে তারা খাবার ও পানি সংকটে পড়েন। গ্রিক কোস্টগার্ড জানিয়েছে, এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শোকের ছায়া ও বিচার দাবি নিহতদের পরিবারে এখন কেবলই কান্নার রোল। ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর খবর পাওয়ায় বাকরুদ্ধ স্বজনরা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, দালালদের প্রলোভনে পড়ে এসব যুবক নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন মানবপাচারকারী দালালদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মৃত্যু আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম দুই মাসেই মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মূলত উন্নত জীবনের আশায় পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়েই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটছে।