কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, একসময়ের জনপ্রিয় মার্বেল খেলা এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। মূলত প্রযুক্তির প্রভাব এবং মাঠের অভাবের কারণে নতুন প্রজন্ম এই খেলা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
প্রযুক্তির গ্রাসে শৈশব স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগে পাড়ায় পাড়ায় ৮ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলেরা নিয়মিত মার্বেল খেলত। এটি কেবল বিনোদন ছিল না, বরং শিশুদের মধ্যে ধৈর্য, একাগ্রতা এবং কৌশলগত দক্ষতা তৈরি করত। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন চলে আসায় তারা মাঠের বদলে ঘরের কোণে সময় কাটাচ্ছে। অনলাইনে গেমস খেলা কিংবা ভিডিও দেখেই পার হচ্ছে তাদের অবসর সময়। ফলে মার্বেলসহ অন্যান্য গ্রামীণ খেলাধুলা বাঙালি সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্মৃতিচারণ করলেন প্রবীণরা উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের নাগাইশ এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল মতিন (৭২) আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের ছোটবেলায় বিকেল হলেই মার্বেল নিয়ে মাঠে নামতাম। কে কত নিখুঁতভাবে মার্বেল মারতে পারে, তা নিয়ে চলত তুমুল প্রতিযোগিতা। এখনকার ছেলেমেয়েরা মোবাইল ছাড়া কিছুই বোঝে না, অনেকেই মার্বেল খেলা চেনেই না।"
একই সুর শোনা যায় মালাপাড়া ইউনিয়নের আসাদনগর এলাকার বজলু মিয়ার (৬৮) কণ্ঠে। তিনি বলেন, "বন্ধুরা মিলে মার্বেল খেলার আনন্দই ছিল আলাদা। এখনকার শিশুরা সারাদিন ডিভাইসে মগ্ন থাকে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা দিচ্ছে।"
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, গ্রামীণ খেলাধুলা শিশুদের মধ্যে সামাজিক ও দলগত মানসিকতা গড়ে তুলত। কিন্তু বর্তমানের 'একাকী জীবন' শিশুদের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক অরূপ সিংহ বলেন, শারীরিক খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, চোখের সমস্যা এবং মানসিক একাকিত্বের ঝুঁকি বাড়ছে। তাদের শারীরিক সক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে।
ঐতিহ্য রক্ষার আহ্বান সচেতন মহলের মতে, হারিয়ে যেতে বসা এসব ঐতিহ্যবাহী খেলা ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুলে ক্রীড়া কার্যক্রমে গ্রামীণ খেলা অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা গেলে আবারও মুখর হয়ে উঠতে পারে গ্রামের মেঠোপথ।