রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে চাঞ্চল্যকর শিক্ষার্থী সাদমান সাইফ রাইভি (২৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এজাহারনামীয় ৪ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় শনিবার (২৮ মার্চ) গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফা আখতার প্রীতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সফল অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় পুলিশের জালে ধরা পড়া চারজন হলেন—আরমান হক বিপু ওরফে যুব (২১), মো. ইসমাঈল হোসেন ফাহিম ওরফে শাফিন (২১), কামরুল ইসলাম রানা (৩০) এবং আলী হোসেন (৫০)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিখোঁজ থেকে মর্গে শনাক্ত: এক করুণ পরিণতি নিহত সাদমান সাইফ রাইভি সিদ্ধেশ্বরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তেজগাঁও এলাকার একটি ‘Pharmaceutical Company’-তে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন। গত ২৩ মার্চ রাত ৯টার দিকে বন্ধুর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
গত ২৬ মার্চ রাইভির বাবা গেন্ডারিয়া থানায় একটি জিডি (General Diary) করেন। ওই দিনই ‘Social Media’-র মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে যাত্রাবাড়ীর উত্তর কুতুবখালী এলাকায় একটি অজ্ঞাত যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে লাশের গায়ে থাকা জার্সিতে ‘RAIVI’ লেখা দেখে স্বজনরা তাকে শনাক্ত করেন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ২৩ মার্চ রাতে কামরুল ইসলাম রানার বাসার ছাদে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে রাইভিসহ অন্য আসামিরা উপস্থিত ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৪ মার্চ ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে গ্রেপ্তারকৃত আরমান হক বিপু ও ইসমাঈল হোসেন ফাহিম রাইভির কাঁধে হাত দিয়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের পেছনে মো. জুবায়ের ও কামরুল ইসলাম রানাকে হাঁটতে দেখা যায়।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, ২৪ মার্চ ভোর থেকে ২৬ মার্চ সকালের মধ্যে যেকোনো সময় আসামিরা পরিকল্পিতভাবে রাইভিকে হত্যা করে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে উত্তর কুতুবখালী খালে ফেলে দেয়।
ডিজিটাল প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা ও প্রধান অভিযুক্তের পলায়ন এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন মো. জুবায়েরকে অত্যন্ত সুকৌশলে ইতিমধ্যে বিদেশে (অস্ট্রেলিয়া) পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অপরাধীরা তাদের অপরাধের চিহ্ন ঢাকতে ঘটনাস্থলের গুরুত্বপূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলারও (Evidence Tampering) চেষ্টা করেছে। তবে পুলিশের ‘Forensic Team’ ও ডিটেকটিভদের প্রচেষ্টায় মূল তথ্যগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে এই ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পলাতক প্রধান আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং মামলার বাকি আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পুলিশ কাজ করছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজধানীর শিক্ষা অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।