• মতামত
  • সুনীল অর্থনীতির বুলু-প্রিন্ট আঁকছে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, সমুদ্রজয়ের স্বপ্নযাত্রায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

সুনীল অর্থনীতির বুলু-প্রিন্ট আঁকছে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, সমুদ্রজয়ের স্বপ্নযাত্রায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

মতামত ১ মিনিট পড়া
 সুনীল অর্থনীতির বুলু-প্রিন্ট আঁকছে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, সমুদ্রজয়ের স্বপ্নযাত্রায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

এক যুগ পেরিয়ে দেশের একমাত্র মেরিটাইম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিলিয়ন ডলারের সমুদ্র সম্পদ আহরণে প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯৫ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের সার্বভৌম অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। এই বিশাল সমুদ্রাঞ্চল এক অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, যা Blue Economy বা সুনীল অর্থনীতি নামে পরিচিত। কিন্তু এই বিপুল সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল বিশেষায়িত জ্ঞান এবং দক্ষ মানবসম্পদ। ঠিক এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই এক যুগ আগে যাত্রা শুরু করেছিল দেশের প্রথম ও একমাত্র সরকারি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়—বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি এক যুগ পূর্ণ করে চট্টগ্রামে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দেশের মেরিটাইম খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্মাণে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

শূন্যতা পূরণ ও স্বপ্নের সূচনা

পূর্বে বাংলাদেশে সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য নাবিক ও অফিসার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও সমুদ্রবিদ্যা, সামুদ্রিক আইন (Maritime Law), বন্দর ব্যবস্থাপনা, অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং (Offshore Engineering) বা সুনীল অর্থনীতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কোনো সুযোগ ছিল না। ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং সমুদ্রতলের বিপুল সম্পদ অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ঠিক সেই ঐতিহাসিক ঘাটতি পূরণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়টি Oceanography, Naval Architecture, Port & Shipping Management, এবং Maritime Law & Policy-এর মতো বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদানের মাধ্যমে দেশের মেরিটাইম সেক্টরের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের পেশাজীবী ও গবেষক তৈরি করছে।

সুনীল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি

ভূমিভিত্তিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকাংশেই সমুদ্রনির্ভর। মৎস্য সম্পদ, সমুদ্রতলের গ্যাস ও খনিজ, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি (Marine Biotechnology), উপকূলীয় পর্যটন এবং শিপিং লজিস্টিকস (Shipping Logistics) খাতে লুকিয়ে আছে বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা। বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে:

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি: বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের বন্দর, শিপিং কোম্পানি, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এবং সমুদ্র সম্পদ আহরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দক্ষ ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী ও নীতি নির্ধারক তৈরি করছে।

গবেষণা ও উদ্ভাবন: সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন, উপকূলীয় প্রকৌশল এবং নতুন সামুদ্রিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করছে এই প্রতিষ্ঠান। যা পূর্বে বাংলাদেশে প্রায় উপেক্ষিতই ছিল।

নীতি নির্ধারণে সহায়তা: সামুদ্রিক আইন, নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় নীতি প্রণয়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথচলা

একটি নতুন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিকে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্বমানের গবেষণাগার, সিমুলেশন সুবিধা, নিজস্ব ট্রেনিং ও গবেষণা জাহাজের মতো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান। তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনা অপরিসীম।

সুনীল অর্থনীতির গুরুত্ব যত বাড়ছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাসঙ্গিকতাও তত বাড়ছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (যেমন: World Maritime University, Shanghai Maritime University) সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা স্থাপন করে জ্ঞান ও গবেষণার মানোন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের ধারাবাহিক সহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করা গেলে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি অচিরেই বিশ্বমানের একটি center of excellence-এ পরিণত হতে পারে।

দিনশেষে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন যদি সমুদ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তবে সেই স্বপ্নের বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি। এই প্রতিষ্ঠানটিই নির্ধারণ করে দেবে, সমুদ্রজয়ের এই বিশাল সুযোগকে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারবে।