পোশাক শিল্পে নতুন বিতর্ক
দেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের কর্মপরিবেশ নিরাপত্তা তদারককারী সংস্থা আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) এবং কারখানামালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র মধ্যে এক নতুন ও জটিল বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কারখানার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত (OSH) বিষয়ের পাশাপাশি अब श्रम অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরএসসি, যা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। মালিকপক্ষের আশঙ্কা, এর ফলে কারখানার বিরুদ্ধে একতরফা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত ক্রয়াদেশ বাতিলের মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
আরএসসির চিঠি ও ক্ষমতার নতুন পরিধি
সম্প্রতি আরএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হক জোটটির অধীনে থাকা কারখানাগুলোকে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে বলা হয়, গত ২০ অক্টোবর লন্ডনে অনুষ্ঠিত আরএসসির Board Meeting-এ কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ইস্যুর বাইরে শ্রম অধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করার বিষয়টি সংস্থার কার্যপরিধিতে যুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
এই নতুন ক্ষমতা বলে আরএসসি এখন থেকে শ্রমিকের অন্যায্য চাকরিচ্যুতি, ছাঁটাই, মজুরি ও ছুটির অধিকার, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, শিশুশ্রম, জবরদস্তিমূলক শ্রম এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের মতো অভিযোগগুলো সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে তা সংশ্লিষ্ট Global Brands বা ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানকে জানানো হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হবে। প্রথম ধাপে আগামী ১৬ নভেম্বর থেকে ৫৮টি ব্র্যান্ডের অধীনে থাকা ১,১৮৫টি কারখানায় এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিদ্ধান্ত নিয়েই পরস্পরবিরোধী অবস্থান
আরএসসির এই পদক্ষেপকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনগুলো। বিজিএমইএ তার সদস্যদের প্রতি এক নির্দেশনায় বলেছে, OSH-বহির্ভূত বিষয়ে আরএসসির কোনো চিঠিতে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ বিষয়টি এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, যিনি ওই বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সভায় এই সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়নি। তিনি বলেন, “আরএসসির প্রটোকল অনুযায়ী, যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে ব্র্যান্ড, শ্রমিক ও মালিক—এই তিন পক্ষেরই সম্মতি প্রয়োজন। আমরা যেহেতু আপত্তি জানিয়েছিলাম, তাই এটি অনুমোদিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।” অনুমোদিত না হওয়া একটি বিষয়ে কেন এমডি চিঠি পাঠালেন, তা জানতে শিগগিরই বোর্ড সভা ডাকা হবে বলে তিনি জানান।
একই সুরে বিকেএমইএ-র সভাপতি ও আরএসসির বোর্ড সদস্য মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “আরএসসি তাদের মূল কাজ অর্থাৎ কারখানার নিরাপত্তা পরিদর্শনই ঠিকমতো করতে পারছে না। এর মধ্যে নতুন দায়িত্ব নিলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।”
তবে শ্রমিক পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার, যিনি সভায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত ছিলেন, তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বোর্ড সভায় বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছিল। তিনি বলেন, “এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শ্রমিকেরা উপকৃত হবেন।”
প্রেক্ষাপট: রানা প্লাজা থেকে আরএসসি
২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ নিরাপদ করতে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট ‘অ্যাকর্ড’ এবং উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট ‘অ্যালায়েন্স’ গঠিত হয়েছিল। অ্যালায়েন্স তাদের কার্যক্রম শেষ করে চলে গেলেও অ্যাকর্ডের উত্তরাধিকারী হিসেবে ২০২০ সাল থেকে কাজ করছে আরএসসি, যেখানে ব্র্যান্ড, ট্রেড ইউনিয়ন এবং শিল্পমালিকদের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এতদিন সংস্থাটির মূল কাজ ছিল কারখানার অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শ্রম অধিকারের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় সংস্থাটির ক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান অচলাবস্থা।