যশোরের মনিরামপুরে প্রচলিত কৃষিব্যবস্থার ধারণা বদলে দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পৌরসভার মহাদেবপুর গ্রামের কৃষক মো. সাহাবুদ্দিন। যখন আগাম সবজি চাষে অধিক কীটনাশকের ব্যবহার একটি সাধারণ চিত্র, সেখানে তিনি সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও আধুনিক পদ্ধতিতে আগাম ফুলকপি চাষ করে দেখিয়েছেন অভাবনীয় সাফল্য। উপজেলা কৃষি অফিসের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মাত্র ২০ শতক জমিতে ফলানো এই ফসলেই তিনি এখন প্রায় তিন লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন, যা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বিষকে ‘না’ বলে প্রযুক্তির হাত ধরে সাফল্য
এই সাফল্যের গল্প শুরু হয় ‘নিরাপদ উচ্চমূল্য সবজি উৎপাদন প্রদর্শনী’ প্রকল্পের আওতায়। মনিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় কৃষক সাহাবুদ্দিন চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর তার ২০ শতক জমিতে ‘নিমজা’ জাতের আগাম ফুলকপির চারা রোপণ করেন। শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদন করা।
এজন্য তিনি প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহারের পথে হাঁটেননি। ফসলের প্রধান শত্রু পোকামাকড় দমনের জন্য তিনি জমিতে স্থাপন করেন ২০টি Sex Pheromone Trap (সেক্সফেরোমন ফাঁদ)। এই আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তার ফসল যেমন বিষমুক্ত থেকেছে, তেমনি উৎপাদন খরচও কমে এসেছে অনেকাংশে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বি. এম. হাফিজুর রহমানের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শে তার এই প্রচেষ্টা অল্প দিনেই সফলতার মুখ দেখেছে।
স্বল্প বিনিয়োগে লাখ টাকার হাতছানি
সঠিক সময়ে সঠিক জাত নির্বাচন এবং আধুনিক প্রযুক্তির অবসান ঘটিয়ে সাহাবুদ্দিনের ক্ষেতে এখন প্রতিটি ফুলকপিই পরিপূর্ণ ও বাজারজাত করার জন্য প্রস্তুত। আকারে বড় ও বিষমুক্ত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে তার এই ফুলকপির চাহিদাও তুঙ্গে। সাহাবুদ্দিনের দৃঢ় বিশ্বাস, এই ২০ শতক জমির ফসল বিক্রি করেই তিনি প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করতে সক্ষম হবেন।
প্রথম ধাপের এই অভাবনীয় সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আর থেমে থাকেননি। সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যে আরও ১০০ শতক জমিতে একই পদ্ধতিতে ফুলকপি চাষের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে পারলে অল্প জমিতেও কৃষিকে একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশায় পরিণত করা সম্ভব।
অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বি. এম. হাফিজুর রহমান বলেন, “উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ মাহমুদা আক্তারের দিকনির্দেশনায় ‘যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় আমরা কৃষক সাহাবুদ্দিনকে এই প্রদর্শনীটি বাস্তবায়নে সহায়তা করেছি। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী। তার এই বিষমুক্ত চাষাবাদের সাফল্য এখন এলাকার অন্য কৃষকদের জন্যও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাহাবুদ্দিনের এই মডেল অনুসরণ করে মনিরামপুরে নিরাপদ সবজি উৎপাদন আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”
সাহাবুদ্দিনের এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত নয়, এটি মনিরামপুরের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, যেখানে নিরাপত্তা ও লাভজনকতা হাতে হাত ধরে চলতে পারে।