বরিশাল ব্যুরো: যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে শরীরে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার দীর্ঘ ১৩ বছর পর অবশেষে বিচার পেলেন স্বজনরা। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে স্বামী শহিদ হাওলাদারকে (৪৭) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২ মার্চ) দুপুরে বরিশালের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের (Fast Track Tribunal) বিচারক মোস্তাক আহমেদ আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায় ও দণ্ডাদেশ
রায়ে আদালত প্রধান আসামি শহিদ হাওলাদারকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত শহিদ হাওলাদার বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দেউলী গ্রামের মৃত আলী হাওলাদারের ছেলে। আদালতের বেঞ্চ সহকারী শাহ আলম খান এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পৈশাচিক সেই হত্যাকাণ্ড ও মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০০৬ সালে শহিদ হাওলাদারের সাথে মাজেদা বেগমের মেয়ে মাহিনুর বেগমের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। তাদের একটি কন্যা সন্তানও ছিল। তবে বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের (Dowry) দাবিতে মাহিনুরের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন শহিদ। যৌতুক না দিলে সংসার করবেন না বলে প্রতিনিয়ত হুমকি দিতেন তিনি।
নির্যাতনের চূড়ান্ত পর্যায়টি ঘটে ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর রাতে। ওই দিন পারিবারিক কলহের জের ধরে শহিদ তার স্ত্রী মাহিনুরের হাত-পা ও মুখ বেঁধে নৃশংসভাবে মারধর করেন। নির্যাতনের এক পর্যায়ে মাহিনুরের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দগ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাহিনুরকে মৃত ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ আইনি লড়াই ও ন্যায়বিচার
এই পৈশাচিক ঘটনার পর মাহিনুরের মা মাজেদা বেগম বাদী হয়ে আটজনকে আসামি করে বাকেরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ বরিশাল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (DB) তৎকালীন এসআই খলিলুর রহমান তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (Charge Sheet) জমা দেন।
পরবর্তীতে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি প্রক্রিয়ায় আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা শেষে সোমবার এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। রায়ের পর ভুক্তভোগী পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করলেও, জড়িত অন্যদের খালাস পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তবে আইনি পর্যবেক্ষকদের মতে, এই রায় সমাজে নারী নির্যাতন ও যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।