• আন্তর্জাতিক
  • ট্রাম্প কেন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান?—পেছনের কারণ আন্দোলন নাকি রক্তপাতহীন নীরব সামরিক কৌশল?

ট্রাম্প কেন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান?—পেছনের কারণ আন্দোলন নাকি রক্তপাতহীন নীরব সামরিক কৌশল?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ট্রাম্প কেন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান?—পেছনের কারণ আন্দোলন নাকি রক্তপাতহীন নীরব সামরিক কৌশল?

‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকদের চাপ ও লাতিন আমেরিকার মাদকের রুট: ভেনেজুয়েলার সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে ট্রাম্পের ‘পরিকল্পনাবহির্ভূত’ যুদ্ধ এড়ানোর কৌশল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে (Nicolas Maduro) ক্ষমতা থেকে সরাতে বদ্ধপরিকর—এমন সংকেত ক্রমে জোরালো হচ্ছে। তবে তাঁর কৌশলটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে কোনো বড় সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ শুরু না হয়। ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের মাত্রা বাড়াচ্ছে এবং এই চাপ এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছাতে চাইছে, যেখানে মাদুরোকে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকেই ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হবে।

মাদকের অভিযোগ ও ক্যারিবীয় সাগরে সামরিক সজ্জা

বর্তমানে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ সীমিত থাকলেও তা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। হোয়াইট হাউস দাবি করছে, তাদের এক ডজনের বেশি নৌকায় হামলার প্রধান কারণ, এসব নৌকায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দশে মাদক বহন করা হচ্ছিল। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “এ মাদক আমাদের গোটা দেশের পরিবারগুলোকে ধ্বংস করছে।” যুদ্ধ প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন, “আমার তা মনে হয় না। কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করেছে।” সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্যারিবীয় সাগর (Caribbean Sea) ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন হামলায় অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তি (Military Deployment) মোতায়েন করেছে। একটি বিমানবাহী রণতরিসহ (Aircraft Carrier) সেনাসদস্যরা ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছেন। এর পাশাপাশি নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে সিআইএ-কে (CIA) ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান (Secret Operation) পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে।

নেপথ্যের চালিকাশক্তি: MAGA সমর্থকদের চাপ

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এই কঠোর অবস্থানের মূল কারণ মাদক পাচারের নগণ্য ভূমিকা নয়, বরং ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থক গোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ মাদক পাচার হয়, তাতে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা সামান্য হলেও, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) আন্দোলনের সমর্থক গোষ্ঠী এবং লাতিন আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর মতো বামপন্থী নেতাদের প্রতি খুব নরম আচরণ করছে। ২০১৩ সালে হুগো চাভেজের (Hugo Chavez) মৃত্যুর পর থেকে মাদুরো ক্ষমতায় আছেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। এই চাপই ভেনেজুয়ালার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ক্রমেই বাড়াচ্ছে।

মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলে চাপ: ক্ষমতাচ্যুতির কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশলটি হলো মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলকে এই বিষয়টি মানতে বাধ্য করা যে, এই শক্তিশালী নেতার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার মূল্য অনেক বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়াতে মাদুরোকে ভেতর থেকেই সরিয়ে দেওয়া উচিত। এই কৌশল ব্যর্থ হলে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি মাদুরোকেই লক্ষ্যবস্তু (Target) করতে পারে।

ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতর থেকে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে আসা কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের (Relationship Repair) চেষ্টা করতে পারেন। অথবা সেনাবাহিনীর কিছু অংশ বিরোধী নেতা মারিয়া মাচাদো ও এদমুন্দো গোনসালেসের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং নতুন নির্বাচনের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি: কিউবার গুপ্তচরবৃত্তি ও মৃত্যুভয়

মাদুরোর লোকদের সঙ্গে আপসরফা করাই যুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র উপায়। শাসক দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা দেশটির সব শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে। মাদুরোকে আলাদা করতে চাইলে নিরাপত্তা বাহিনী এমন নিশ্চয়তা দাবি করবে, যাতে তাদের নিরাপত্তা, দেশের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদে প্রবেশগম্যতার অধিকার সুরক্ষিত থাকে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ভেনেজুয়েলার পদস্থ সামরিক নেতৃত্ব জানেন যে মাদুরো কিউবার গোয়েন্দাব্যবস্থাকে (Cuban Intelligence) তাঁর নিজ দেশের জেনারেলদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করেন। ফলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টার অর্থই হলো মৃত্যুদণ্ডের (Death Penalty) ঝুঁকি। এই ঝুঁকি কমাতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মাদুরো সরকারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যাতে অন্যদের ওপর চাপ তৈরি করা যায়।

ট্রাম্পের উচ্চ ঝুঁকি ও শেষ সিদ্ধান্ত

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন, মাদুরোকে সরাতে ব্যর্থ হলে সেটি তাঁর জন্য লজ্জার কারণ হবে। অন্যদিকে, মাদুরোকে যদি সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে (Military Intervention) সরানো হয়, তবে ভেনেজুয়েলার ভেতরের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে গৃহযুদ্ধ (Civil War) হলে তাতে যে রক্তগঙ্গা বইবে, তার জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করা হবে।

সিনেটে যেহেতু ট্রাম্পের যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টকেই নিতে হবে। এখন পর্যন্ত তিনি এমন কোনো কৌশল বেছে নিতে পারেননি, যা তাঁকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেবে এবং রক্তপাত এড়াবে।