চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই তারিখ ঘোষণা করতে পারেন, এমন সম্ভাবনাকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গ্রহণ করা হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এরই মধ্যে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশব্যাপী নাশকতা ও অগ্নি-সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৩ নভেম্বর দেশব্যাপী ‘লকডাউন’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে যেকোনো ধরনের নাশকতা কঠোর হস্তে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও তৎসংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে সেনা সদরে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও গুরুতর অভিযোগসমূহ
গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। পরবর্তীতে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই মামলায় রাজসাক্ষী (Approver) হওয়ার আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলার বিচারকার্যে প্রসিকিউশন মোট পাঁচটি প্রধান অভিযোগ উপস্থাপন করে, যার মধ্যে রয়েছে:
প্রথম অভিযোগ: ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। অভিযোগ অনুযায়ী, এর জের ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র দলীয় সন্ত্রাসীরা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর পদ্ধতিগত আক্রমণ চালায়, যাতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজার আহত হন।
দ্বিতীয় অভিযোগ: হেলিকপ্টার ও ড্রোনের মাধ্যমে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়রের সঙ্গে তার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে এই অভিযোগে বলা হয়, তার নির্দেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় কর্মীরা মারণাস্ত্র ব্যবহার করে, যার ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ বা সর্বোচ্চ দায় তার ওপর বর্তায়।
তৃতীয় অভিযোগ: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
চতুর্থ অভিযোগ: রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত ছয়জন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।
পঞ্চম অভিযোগ: আশুলিয়ায় ছয়জন নিরীহ ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার দায়ও অভিযুক্তদের ওপর আনা হয়েছে।
‘লকডাউন’ বনাম সর্বোচ্চ সতর্কতা
রায়ের তারিখ নির্ধারণকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকা ‘লকডাউন কর্মসূচি’ ঘিরে রাজধানীতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে ১৩টির বেশি বাসে অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, নাশকতা সৃষ্টির জন্য ঢাকার বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে আনা হচ্ছে।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানাসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি বুধবার ভোর থেকে হাইকোর্ট, বাংলা একাডেমি, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে শেখ মো. সাজ্জাত আলী নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, জনমনে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা চললেও রাজধানীতে শঙ্কার কিছু নেই।
রাজপথে প্রতিরোধের ঘোষণা বিভিন্ন দলের
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘লকডাউন’ ও নাশকতা প্রতিহত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, নাশকতা প্রতিরোধে আটটি দল সরকারের পাশে থেকে মাঠে থাকবে। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তিকে’ রাজপথে প্রতিহত করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা সম্মিলিতভাবে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।