কাবুল থেকে কান্দাহার: ঔপনিবেশিক শাসনের রক্তক্ষয়ী অবসান
২০২১ সালে বিশ বছরের যুদ্ধে জয়লাভের পর আফগানিস্তানে তালেবানের (Taliban) সরকার গঠন এবং ‘ইসলামি আমিরাতের’ শাসন প্রতিষ্ঠা দেশটির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। আফগানিস্তান ঘুরে দেখা সেই ‘নতুন’ আফগানিস্তানের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা যৌথ বাহিনীর (Western Coalition Forces) বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্য এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে এই বিপ্লবের তাৎপর্য।
রাজধানী কাবুলের লাগোয়া লোগার প্রদেশের পোরাখ গ্রাম থেকে শুরু করে কান্দাহারের মিরওয়েজ মহল্লা পর্যন্ত সবখানেই একটাই স্লোগান: “আমরা জয়লাভ করেছি।” এই জয় লাখো প্রাণের বিনিময়ে হলেও, আফগানিস্তানকে ঔপনিবেশিক শাসন (Colonial Rule) থেকে মুক্ত করার জন্য সাধারণ মানুষের, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের মানুষের কৃতজ্ঞতা ভোলা কঠিন।
কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট ও মানবিক বিপর্যয়
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট’-এর হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ২০ বছরের এই যুদ্ধে (২০০১-২০২১) সরাসরি আনুমানিক ১ লাখ ৭৬ হাজার জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬ হাজার ৩১৯ জন বেসামরিক মানুষ। পরোক্ষ কারণে (ক্ষুধা এবং রোগ) আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ মারা গেছেন। ২০ বছরের যুদ্ধে জনসংখ্যার ০.৪ থেকে ০.৬ শতাংশ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন।
পোরাখের হামদুল্লাহ: লোগার প্রদেশের পোরাখ গ্রামের রুহুউল্লাহ স্তানিকজাইয়ের ২০ বছর বয়সী পুত্র হামদুল্লাহ ছিলেন একজন তালেবান মুজাহিদ। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক সামরিক যৌথ বাহিনীর বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়। বৃদ্ধ পিতা শোক সত্ত্বেও বলেন, “ছেলের মৃত্যু বৃথা যায়নি। আমরা জয়লাভ তো করেছি।”
কান্দাহারের ফিদা মহম্মদ: কান্দাহারের মিরওয়েজ মহল্লার ফিদা মহম্মদ ২০০৬ সালের বিমান হামলায় তাঁর পা হারান। তাঁর পরিবারের নাবালক ছেলে-মেয়েসহ ১৪ জন শহীদ হন। বিমান হামলা ও গোলাগুলির কারণে এই পরিবারটি গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে কৃত্রিম পায়ে সংসার চালাচ্ছে।
মুজাহিদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আইনের শাসন
নতুন সরকার আসার পর প্রায় পাঁচ বছর ধরে যুদ্ধ ও মৃত্যু বন্ধ হওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তালেবান ও মুজাহিদদের কাছে সাধারণ মানুষ কৃতজ্ঞ। এই নতুন শাসনের প্রধান সাফল্য হলো—দেশে একটি সামগ্রিক আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠা করা।
কৃষি বিজ্ঞানী ইঞ্জিনিয়ার মহম্মদ তাহের স্তানিকজাই বলেন, “প্রায় প্রতি রাতেই গ্রামের ভেতরে ঢুকে আসতো রিপাবলিকের বাহিনী, আবার পাল্টা হামলা চালিয়ে মুজাহিদরা তাদের ঠেলে দিত। এই রাতযুদ্ধের আতঙ্ক আর নেই।” তিনি তাঁর সাবেক পুলিশ মুখপাত্র পুত্র হাসমত-এর সামনেই বলেন, “লড়াইটা এরা না করলে গ্রামাঞ্চলে হয়তো আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাম।”
জোটবদ্ধ সমাজ: পশ্চিমা আক্রমণের প্রভাব
আফগানিস্তানে পাঠান, হাজারা, তাজিক, উজবেকসহ নানান সম্প্রদায় ও জাতির মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০ বছরের যুদ্ধ এদের আপাতত জোটবদ্ধ করেছে। পশ্চিমা বাহিনীর ধারাবাহিক বোমা হামলা, গুম, খুন এবং রাতবিরেতে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখার ঘটনা আফগানিস্তানের সমাজকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। তালেবানের নেতৃত্বাধীন ইসলামের মাধ্যমে এদের এক সূত্রে বেঁধে ফেলার কৃতিত্ব মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবানের। পশ্চিমা আক্রমণ ছাড়া এটা হতো না—এই সত্যটিই এখন আফগানিস্তানের জিও-পলিটিক্সে (Geo-Politics) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর (Factor)।