• দেশজুড়ে
  • নাগলিঙ্গম রহস্য উন্মোচন: রাজধানীতে একই বৃক্ষে দুই ভিন্ন রঙের ফুল! বিরল মারুন ছায়ার সন্ধান কি নতুন 'ভ্যারিয়েন্ট'?

নাগলিঙ্গম রহস্য উন্মোচন: রাজধানীতে একই বৃক্ষে দুই ভিন্ন রঙের ফুল! বিরল মারুন ছায়ার সন্ধান কি নতুন 'ভ্যারিয়েন্ট'?

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
নাগলিঙ্গম রহস্য উন্মোচন: রাজধানীতে একই বৃক্ষে দুই ভিন্ন রঙের ফুল! বিরল মারুন ছায়ার সন্ধান কি নতুন 'ভ্যারিয়েন্ট'?

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দেখা গেল গাঢ় মেরুন রঙের বিরল নাগলিঙ্গম। লেখকের পর্যবেক্ষণ: বহুচর্চিত এই বৃক্ষের কি ভিন্ন কোনো 'ভ্যারিয়েন্ট' রয়েছে, যা আগে চরিত্রায়ণ করা হয়নি?

স্রষ্টার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির মধ্যে নাগলিঙ্গম ফুল তার অদ্ভুত গড়ন এবং মনমাতানো সুগন্ধের জন্য চিরকালই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়। রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল) প্রাঙ্গণে দুটি নাগলিঙ্গমগাছের ফুলের দিকে নিবিড় দৃষ্টি রাখতেই এক নিসর্গী আবিষ্কার করেছেন এক নতুন রহস্য—ফুলের রঙের ভিন্নতা।

প্রায় প্রতিদিনই এই চত্বরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নাগলিঙ্গমগাছ দুটির দিকে নজর রাখতে গিয়ে লেখক খেয়াল করেন, একটি গাছের ফুল ফিকে লাল বা হালকা গোলাপি বর্ণের হলেও, অন্যটির ফুল টকটকে মেরুন লাল বা ঘন লাল।

ঢাকার উদ্যানে বিরল রঙের খোঁজ: নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে প্রশ্ন

এই পর্যবেক্ষণ লেখকের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে—তবে কি নাগলিঙ্গম ফুলেরও ভিন্ন ভিন্ন Variant (ভ্যারিয়েন্ট) বা Cultivar (চাষকৃত জাত) রয়েছে, যা এর আগে যথাযথভাবে Characterized (চরিত্রায়ণ) বা Documented (দলিলভুক্ত) করা হয়নি?

লেখক এর পর রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণ, মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানের নাগলিঙ্গমগাছের ফুল পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রায় সব জায়গার ফুলই প্রথাগত লাল বা ফিকে লাল রঙের। কিন্তু ঘন মেরুন রঙের এই ফুলটি আর অন্য কোথাও তার চোখে পড়েনি। তুলনামূলকভাবে নবীন এই গাছটির ফুল এমন আলাদা হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়েই প্রখ্যাত নিসর্গী দ্বিজেন শর্মার নাগেশ্বর ফুল আবিষ্কারের কাহিনীর প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন লেখক। এই ভিন্নতা উদ্যানতত্ত্ব বা Botany (উদ্ভিদবিজ্ঞান) এর গবেষকদের জন্য নতুন এক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

নাগলিঙ্গমের অদ্ভুত গড়ন: সুরভি আছে, মধু নেই

নাগলিঙ্গমের Botanical Name হলো Couroupita guianensis এবং এটি Lecythidaceae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এটি পাতাঝরা প্রকৃতির এক Perennial Tree (বহুবর্ষী বৃক্ষ) যা প্রায় ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ফুল ফোটার প্রক্রিয়া। গাছের মোটা কাণ্ড বা Trunk-এর চারদিক থেকে শলা বা কাঠির মতো কুঁড়িসহ মঞ্জরিদণ্ড বেরিয়ে আসে, যার আগায় একসঙ্গে একাধিক ফুল ফোটে।

এই ফুলগুলোর গড়ন একেবারেই অদ্ভুত, যেন অসংখ্য দাঁত বের করে হাঁ করে থাকা কোনো সাপের ফণা! এর জননাঙ্গটি সাদাটে, যা দেখতে দুই পাটি মাড়ির মতো। এর ওপরের অংশে গেঁথে থাকে অসংখ্য হলদে-গোলাপি লোমের মতো পুংকেশর (Male Stamen) এবং নিচে থাকে ঘন লাল রঙের খাড়া কেশরগুচ্ছ। ফুলের এমন গড়নই এটিকে 'নাগলিঙ্গম' নামটি দিয়েছে।

ফুলের সুমিষ্ট সৌরভে চারপাশ আমোদিত হলেও, এটি তার গঠনের মতোই অদ্ভুত—কারণ নাগলিঙ্গম ফুল Nectar (মধু) শূন্য। এই মধুশূন্যতা সত্ত্বেও ফুলের সৌন্দর্যে ও গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসে কীটপতঙ্গরা।

পরাগায়ন কৌশল: কাঠ মৌমাছির পারস্পরিক মেলবন্ধন

নাগলিঙ্গম ফুল Pollination Mechanism (পরাগায়ন প্রক্রিয়া)-এর জন্য বিশেষভাবে নির্ভরশীল বড় আকারের কাঠ মৌমাছিদের উপর। মধু না থাকায় অন্যান্য পতঙ্গ নিরাশ হয়ে ফিরে গেলেও, কাঠ মৌমাছিরা ফুলের পরাগ বা রেণু (Pollen) সংগ্রহ করতে থেকে যায়। ফুলের হলদে গুঁড়োর মতো এই রেণুই কাঠ মৌমাছিদের ছানাদের খাবার।

কাঠ মৌমাছিরা যখন তাদের মাথা ও পিঠে এই রেণু মেখে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে যায়, তখন তারা অজান্তেই ফুলের Pollination (পরাগায়ন) ঘটিয়ে বীজ ও ফল গঠনে সাহায্য করে। এটি প্রকৃতিতে এক চমৎকার Mutualism (পারস্পরিক মেলবন্ধন) এবং Ecological Balance (বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য)-এর উদাহরণ।

কামানের গোলা ফল ও দুর্গন্ধের বৈপরীত্য

পরাগায়নের পর নাগলিঙ্গম গাছে ফল ধরে, যা দেখতে অনেকটা কামানের গোলার মতো সুগোল ও শক্ত খোলসবিশিষ্ট। তবে এখানেও রয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ফুলের যেমন সুমিষ্ট সৌরভ, তেমনি পাকা ফল যখন সশব্দে মাটিতে পড়ে ফেটে যায়, তখন তা ছড়ায় ততটাই তীব্র Foul Smell (দুর্গন্ধ)।

এই ঝরে পড়া ফলগুলো কোনো কোনো স্তন্যপায়ী বন্য প্রাণী ভেঙে শাঁস খায়। বিশেষ করে হাতিদের কাছে এটি অসম্ভব প্রিয়। প্রাণীরা ফল খাওয়ার পর তাদের পেটের ভেতরে থাকা বীজের Germination (অঙ্কুরোদগম) ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মলত্যাগের মাধ্যমে সেই বীজ মাটিতে ছড়িয়ে নতুন চারা তৈরি হয়। ফল থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা বীজের সজীবতা কম থাকায় শাখা কেটে কলম করে চারা তৈরি করা হয়।

একসময় দুর্লভ এই বৃক্ষকে ভাওয়াল রাজবাড়ির গাছটিকে অতীতে 'হাতিগাছ' বা 'অচিনবৃক্ষ' নামে সম্বোধন করা হতো। বর্তমানে Biodiversity (জীববৈচিত্র্য) সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় এটি এখন বিভিন্ন শহরে ও উদ্যানে দেখা যাচ্ছে।