রাজধানীর পুরান ঢাকায় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিত তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অবশেষে মামলা দায়ের করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর শনিবার (১৫ নভেম্বর) সূত্রাপুর থানায় নিহত মামুনের স্ত্রী বিলকিস আক্তার রীপা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। তবে চাঞ্চল্যকর এই মামলায় সুনির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করে ১০ থেকে ১২ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে, যা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুই পেশাদার শুটারসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করার পরেও কেন মামলায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলো না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
মামলার বিলম্ব ও পুলিশের ব্যাখ্যা এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "আসামিদের অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের মাধ্যমে কারা জড়িত তা বের করবেন।" পুলিশের এই ব্যাখ্যায় একটি স্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও, হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের নাম মামলায় না থাকায় জনমনে কৌতূহল বাড়ছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড গত ১০ নভেম্বর, সোমবার, বেলা ১১টার দিকে আদালতে হাজিরা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে সূত্রাপুর এলাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মামুন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন এবং দুজন আততায়ী পেছন থেকে কোমর থেকে পিস্তল বের করে তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালাচ্ছে। গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর হত্যাকারীরা একটি মোটরসাইকেলে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ মামুনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নেপথ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব? পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত তারিক সাইফ মামুন রাজধানীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন এবং臭ख्यात ‘ইমন-মামুন গ্রুপের’ অন্যতম প্রধান ছিলেন। একসময় তিনি আরেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী থাকলেও পরবর্তীকালে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও একটি পুরোনো শত্রুতার সন্দেহও জোরালো হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে মোহাম্মদপুরে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের ভাই টিপু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন মামুন। সেই ক্ষোভ থেকে জোসেফের নির্দেশে এটি একটি target killing হতে পারে বলেও ধারণা করছে পুলিশের একটি অংশ।
ডিবি'র জালে শুটার, বেরিয়ে এলো মূল পরিকল্পনাকারীর নাম হত্যাকাণ্ডের পরদিন, ১১ নভেম্বর, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এই হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়া দুই শুটারসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—শুটার ফারুক ওরফে কুত্তা ফারুক ও রবিন এবং তাদের সহযোগী ইউসুফ, রুবেল ও শামীম। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
ডিবি'র দাবি, গ্রেপ্তার ফারুক ও রবিন পেশাদার শুটার। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া নগদ টাকা এবং খুনের কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী রনি নামের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী। একসময়ের মুদি দোকানি রনি বর্তমানে কাফরুলের বাসিন্দা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। রনি নিজেই শুটারদের সঙ্গে দুই লাখ টাকায় চুক্তি করে এবং অস্ত্র সরবরাহ করে। মূল পরিকল্পনাকারী রনি বর্তমানে পলাতক রয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।