• দেশজুড়ে
  • মনিরামপুরের ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স’: বিনামূল্যে মৃতদেহ পরিবহনে দেশজুড়ে মানবতার এক নতুন ইতিহাস

মনিরামপুরের ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স’: বিনামূল্যে মৃতদেহ পরিবহনে দেশজুড়ে মানবতার এক নতুন ইতিহাস

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
মনিরামপুরের ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স’: বিনামূল্যে মৃতদেহ পরিবহনে দেশজুড়ে মানবতার এক নতুন ইতিহাস

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা দূর করে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মৃতদেহ পৌঁছে দিচ্ছে এই মানবিক উদ্যোগ; উদ্যোক্তা ডা. মেহেদী হাসান ও পরিচালকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

মৃত্যুর মুহূর্তে মানবিক আশ্রয়: এক অনন্য উদ্যোগ

মৃত্যুর মুহূর্ত একটি পরিবারের জন্য চরম শোক এবং আর্থিক সংকটের সময়। এই কঠিন বাস্তবতায় মৃতদেহ পরিবহনের মতো মৌলিক প্রয়োজনও বহু মানুষের জন্য দুঃসহ হয়ে ওঠে। ঠিক এই প্রয়োজনের জায়গা থেকেই যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলায় জন্ম নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী ও অনন্য মানবিক উদ্যোগ— 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স'। এই সেবাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মৃতদেহ পরিবহন করে মনিরামপুরে পৌঁছে দেয়। সেবা গ্রহণকারী পরিবারকে এক টাকাও বহন করতে হয় না; এমনকি পদ্মা সেতু, মধুমতী উড়ালসেতু বা অন্যান্য মহাসড়কের টোলও কর্তৃপক্ষ বহন করে থাকে।

করোনা-যুদ্ধ থেকে জন্ম নেওয়া মানবিক ব্রত

২০২৪ সালের ১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই মানবিক উদ্যোগটির প্রধান উদ্যোক্তা হলেন মনিরামপুরের কৃতী সন্তান এবং করোনা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত মানবিক ডাক্তার মেহেদী হাসান। প্রাণঘাতী মহামারির সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, অ্যাম্বুলেন্সের দুষ্প্রাপ্যতা বা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে মরদেহ পরিবহন একটি পরিবারের জন্য কতটা কঠিন হতে পারে। সেই মর্মান্তিক বাস্তবতা থেকেই মানুষের শেষ যাত্রায় মানবিক সহায়তার ব্রত নিয়ে গড়ে ওঠে এই উদ্যোগ।

এই সেবার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. শাহ্ জালাল, যিনি দিন-রাত নিবেদিতভাবে এটি পরিচালনা করছেন। দেশের যেকোনো প্রান্তে কেউ মারা গেলেই ফোন পেলে অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত রওনা দেয়। দীর্ঘ পথের টোল, জ্বালানি, কর্মীদের ভাতা—সবই এই উদ্যোগ বহন করে।

'মানবতার সর্বোচ্চ রূপ'

জাতীয় দৈনিক নাগরিক ভাবনা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ও যশোরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বিনিময় ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী সাইমুম রেজা পিয়াস দীর্ঘ সময় ধরে সমাজসেবামূলক উদ্যোগে যুক্ত। 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এ ধরনের সেবা শুধু মনিরামপুর নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য একটা গর্বের বিষয়।"

তিনি মন্তব্য করেন, যখন বাণিজ্যিক অ্যাম্বুলেন্সগুলো অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে, তখন কেউ যদি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে—এমনকি সেতুর টোল পর্যন্ত বহন করে মৃতদেহ পৌঁছে দেয়, "এটি নিঃসন্দেহে মানবতার সর্বোচ্চ রূপ।" তাঁর মতে, সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বহু সামাজিক উদ্যোগের খবর লিখলেও, 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স'-এর মতো নির্মোহ, নিঃস্বার্থ সেবা খুব কমই দেখেছেন। তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগ সমাজের মূল্যবোধ টিকিয়ে রেখেছে এবং এটি মানবিকতার নতুন ইতিহাস লিখছে।

পরিচালকের নিবেদন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

সেবাটির পরিচালক মো. শাহ্ জালাল জানান, রাত-দিন যেকোনো সময় ফোন পেলে তাঁরা প্রস্তুত থাকেন। রাত তিনটা হোক বা ভোর পাঁচটা, যেকোনো সময় অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, "আমি আমার দায়িত্ব মনে করে কাজটা করি। পরিবার যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন অন্তত পরিবহনের চিন্তা যেন না করতে হয়—এটাই দেখতে চাই।"

যদিও সেবাটির মাসিক ব্যয় যথেষ্ট, তবুও তাঁরা কখনো কোনো পরিবারকে খরচ নিতে দেননি। পরিচালক আশা করেন, সমাজের মানবিক মানুষরা পাশে দাঁড়ালে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে।

জাতীয় পর্যায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন

মনিরামপুরবাসী এই সেবাকে উপজেলাবাসীর গর্ব বলে মনে করছেন। এটি শুধু একটি অ্যাম্বুলেন্স নয়, বরং নিরাপত্তা, সম্মান ও ভরসার প্রতীক। এটি প্রমাণ করেছে—একটি উপজেলার একটি উদ্যোগও জাতীয়ভাবে উদাহরণ হতে পারে। অনেকেই আশা করছেন, দেশের বিভিন্ন জেলায়ও এমন সেবা ছড়িয়ে পড়বে, যাতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি দুঃসময়েও মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে তাদের প্রিয়জনকে বাড়িতে আনতে পারে।

মনিরামপুরের 'আমাদের অ্যাম্বুলেন্স' শুধু মৃতদেহ বহন করে না; এটি বহন করছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক নৈতিকতার এক উজ্জ্বল বার্তা, যা সমাজে Social Responsibility-এর এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

Tags: monirampur amader ambulance free transport dead body humanitarian initiative dr mehadi hasan saimum reza pias social responsibility communal harmony charitable service