বান্দরবানের লামায় অবৈধ ইটভাটা বা Illegal Brick Kiln উচ্ছেদে পরিচালিত বিশেষ অভিযান ঘিরে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) দুপুরে অভিযান পরিচালনাকারী ভ্রাম্যমাণ আদালতের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটভাটা শ্রমিক ও মালিকপক্ষ অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়াপাল্টা ধাওয়ায় এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হামলায় পুলিশ ও বিজিবির অন্তত সাত সদস্য আহত হয়েছেন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িসহ একাধিক সরকারি যানবাহন ভাঙচুরের শিকার হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ ও ধড়পাকড় চালায়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে আটজনকে আটক বা Detain করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে শেষ পর্যন্ত অভিযান স্থগিত করে ফিরে আসতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
হামলার বিবরণ: ফাইতং যখন রণক্ষেত্র
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশে কয়েকদিন ধরেই বান্দরবানে অবৈধ ইটভাটা বিরোধী ‘বিশেষ অভিযান’ বা Special Drive চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার দুপুরে লামার ফাইতং পাগলীর আগা এলাকার ইটভাটাগুলোতে অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা হয় একটি শক্তিশালী Task Force। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজুয়ান উল ইসলাম।
গাড়িবহরটি কক্সবাজারের চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলি এলাকা অতিক্রম করার সময় আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শত শত বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও মালিকপক্ষের লোকজন রাস্তা অবরোধ করে। দুপুর ১২টার দিকে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় এবং একপর্যায়ে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের গাড়িবহর লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে।
হামলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে সংঘর্ষ বেধে যায়। বেলা ৩টা পর্যন্ত চলা এই উত্তেজনার পর অভিযান স্থগিত বা Suspended ঘোষণা করা হয়।
প্রশাসনের বক্তব্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম সেনা জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর হাফিজ, লামার সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমেদ এবং লামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে ছিল।
সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমেদ জানান, “ইটভাটা মালিক ও শ্রমিকরা সংঘবদ্ধভাবে প্রশাসন এবং Law Enforcement Agencies-এর ওপর হামলা চালায়। তারা সরকারি কাজে বাধা দেয় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে। হামলায় প্রশাসনের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।”
লামা থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, হামলাকারীদের মধ্য থেকে আটজনকে আটক করে চকরিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর বা Handover করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
শ্রমিকদের ক্ষোভ ও পাল্টা অভিযোগ
অন্যদিকে, ইটভাটা মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, কর্মসংস্থান হারানো এবং উচ্ছেদের প্রতিবাদে তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলেন। তাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে চলা এই অভিযানে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তারা কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছিলেন।
শ্রমিকদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ তাদের পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জনেরও বেশি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। শ্রমিক নেতাদের মতে, কোনো পুনর্বাসন বা Rehabilitation পরিকল্পনা ছাড়াই ঢালাওভাবে ভাটা বন্ধ করে দেওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন।
পরিবেশ রক্ষায় জিরো টলারেন্স
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে এই অভিযান বা Crackdown অব্যাহত থাকবে। পাহাড় ও পরিবেশ ধ্বংসকারী এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। তবে আজকের হামলার ঘটনা প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন করে নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে।