শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৯ মিনিট। হঠাৎ কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে মাঝারি মাত্রার কম্পন মনে করা হলেও, ভূতত্ত্ববিদরা একে দেখছেন এক ভয়াবহ ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে। ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আঘাত হানা এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
আতঙ্কজনক তথ্য হলো, এই কম্পনে যে পরিমাণ Energy Release বা শক্তি নির্গত হয়েছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার শক্তির সমান। রাজধানী ঢাকায় চারজনসহ সারা দেশে অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানি এবং অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, মাটির গভীরে বড় কোনো বিপদের প্রস্তুতি চলছে।
হিরোশিমার বোমার সমান শক্তি: নরসিংদীর কম্পন কেন ব্যতিক্রম?
ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবিরের মতে, নরসিংদীর মাধবদীতে সৃষ্ট এই কম্পন কেবল বাংলাদেশ নয়, কাঁপিয়ে দিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গকেও। কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অনুভূত হয়েছে এই ঝাঁকুনি। তিনি বলেন, “একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে যে পরিমাণ বিধ্বংসী শক্তি নির্গত হয়, শুক্রবারের এই ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঠিক সেই মাত্রার শক্তি রিলিজ হয়েছে।”
ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় Seismic Zone বা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা রয়েছে চরম ঝুঁকির মুখে। ২০০৩ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ মূলত তিনটি গতিশীল Tectonic Plate—ইন্ডিয়ান প্লেট, বার্মা প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।
৮০০ বছরের পুঞ্জীভূত শক্তি: ৮.২ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্ডিয়ান ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলটি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের হাওর হয়ে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিশাল Fault Line বা চ্যুতিরেখায় গত ৮০০ থেকে ১০০০ বছর ধরে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হচ্ছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, প্লেটের সংযোগস্থলে জমে থাকা এই শক্তি যদি একবারে নির্গত হয়, তবে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ২ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে। আর যদি শক্তি আংশিকভাবে বের হয়, তবুও তার মাত্রা হবে ধ্বংসাত্মক। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের অংশজুড়ে থাকা এই চ্যুতিরেখায় যেকোনো একটি দেশে কম্পন হলে, তা পার্শ্ববর্তী দেশেও উচ্চমাত্রার Shockwave তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ঘনঘন ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদেরই পূর্বাভাস।
পরিসংখ্যানের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী: বাড়ছে ফ্রিকোয়েন্সি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের Frequency বা পুনরাবৃত্তির হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশে ও এর আশপাশে ভূমিকম্প হয়েছিল ২৮টি।
২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টিতে।
২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে ৫৩টিতে পৌঁছেছে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের গত তিন মাসেই এই অঞ্চলে ৬০টিরও বেশি বিভিন্ন মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে। ছোট ও মাঝারি মাত্রার এই ঘনঘন কম্পন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বড় ধরনের শক্তি বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, দেশে ৭ মাত্রার বা তার চেয়ে বড় ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় আর বেশি দূরে নয়।
ঢাকার ৪০ শতাংশ ভবন ধসের শঙ্কা: উদ্ধার তৎপরতা অসম্ভব?
যদি সত্যি ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটবে রাজধানী ঢাকায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বা Unplanned Urbanization-এর শিকার এই মেগাসিটির প্রায় ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকার অলিগলি ও সরু রাস্তাঘাট উদ্ধার অভিযানের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। ভবন ধসের পর বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো Utility Service বা জরুরি সেবাগুলো মুহূর্তেই অকেজো হয়ে পড়বে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালানোর মতো পর্যাপ্ত ভারী যন্ত্রপাতি বা Rescue Equipment এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বাংলাদেশের নেই বললেই চলে। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
চিলি বনাম হাইতি: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাঠ
উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ধকল সামলানোর ক্ষেত্রে হাইতি ও চিলির উদাহরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। হাইতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। অন্যদিকে, চিলিতে ৮.৮ মাত্রার—যা হাইতির চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী—ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫২৫ জন।
এর মূল কারণ Disaster Management বা দুর্যোগ প্রস্তুতি। চিলিতে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণ এবং কঠোর Building Code মানার কারণে এত বড় দুর্যোগেও বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল ছিল। এমনকি দেশটির স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকে ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা হয়েছে।
করণীয় ও সুপারিশ: ‘রিট্রোফিটিং’ ও সচেতনতাই রক্ষাকবচ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর একমাত্র উপায় হলো প্রস্তুতি। ১. ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ: রাজধানীর অতি পুরোনো ও জীর্ণ ভবনগুলো অবিলম্বে চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলতে হবে। ২. রিট্রোফিটিং: যেসব ভবন কিছুটা সংস্কারযোগ্য, সেগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিতে Retrofitting করে ভূমিকম্প সহনীয় করতে হবে। ৩. জনসচেতনতা: কম্পন শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে ‘Drop, Cover, and Hold on’ পদ্ধতি অনুসরণ করা, মেইন সুইচ বন্ধ করা এবং বিম বা শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়ার মতো বিষয়গুলো নাগরিকদের জানতে হবে।
নরসিংদীর এই ‘অ্যাটম বোমার’ মতো কম্পন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, মাটির নিচের বিপদ আর সুপ্ত নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, ভবিষ্যতে কেবল আফসোস করার সময়টুকুও হয়তো পাওয়া যাবে না।