চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর - NBR) ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতির (Revenue Deficit) সম্মুখীন হয়েছে। এই বিশাল ঘাটতির মধ্যেও এনবিআর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা (Revenue Target) সংশোধনের নামে জনগণের কাঁধে নতুন করে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকার করের বোঝা চাপাচ্ছে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে এনবিআর নিজেই এই বিপুল পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে ঘাটতির মধ্যে এত বিশাল সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রথম ঘটনা।
অর্থ বিভাগের নির্দেশ ৪ হাজার কোটি, এনবিআর বাড়ালো ৫১ হাজার কোটি!
এনবিআর সূত্র অনুযায়ী, গত ১০ নভেম্বর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির সভায় চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।
পরের দিন, অর্থাৎ ১১ নভেম্বর, অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে এনবিআর-কে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিভাজন প্রস্তুত করে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে অর্থ বিভাগে পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু অর্থ বিভাগের মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর নির্দেশনার বিপরীতে এনবিআর গত ২০ নভেম্বর আরও ৫১ হাজার কোটি টাকা বেশি বাড়িয়ে নতুন রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এই বাড়তি লক্ষ্যমাত্রার বোঝা আদায়ে আয়কর (Income Tax) ও ভ্যাট (VAT) অনুবিভাগকে ৩৭ শতাংশ করে এবং কাস্টম (Custom) অনুবিভাগকে ২৬ শতাংশ ভূমিকা রাখতে হবে।
নতুন লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর-এর গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগের মহাপরিচালক মো. আবদুল হাকিম ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও অর্থ বিভাগের ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর নির্দেশনার বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেন।
আইএমএফের চাপেই কি এই সিদ্ধান্ত?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহল বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ - IMF) চাপেই এনবিআর রাজস্ব আহরণের এই অবিশ্বাস্য নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, এনবিআর সব সময় অভিযোগ করে যে তাদের ওপর বড় লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে অর্থ বিভাগের মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর নির্দেশনার পর কীভাবে সংস্থাটি আরও ৫১ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারে—এটা বোধগম্য নয়।
এই অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তোলেন, রাজস্ব আহরণ হুট করে ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর মতো কোনো নতুন অর্থনৈতিক ঘটনা কি দেশে ঘটেছে? তিনি বলেন, অর্থনীতির মূল্যায়নে বা করনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) চার-পাঁচ শতাংশের দিকেই থাকবে। এই অবস্থায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এত বিশাল পরিমাণে বাড়ানোর নীতির দিক থেকে কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার (Institutional Reform) ছাড়া এই পদক্ষেপ অযৌক্তিক। তবে আইএমএফের চাপে এটি করা হয়েছে—এমন একটি আলোচনা রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আইএমএফের চাপে এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও পরবর্তীতে যদি রাজস্ব আহরণ না বাড়ে, তবে আইএমএফের কাছে কোনো জবাব দেওয়া যাবে না।
ঘাটতির চিত্র: ৪ মাসে ১৭ হাজার কোটি টাকা
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজস্ব ঘাটতির মধ্যেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার নামে এত বিশাল অঙ্কের বাড়তি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এনবিআর।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ আলোচ্য সময়ে এনবিআর আদায় করেছে মাত্র ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এই বিপুল ঘাটতির মধ্যেই এনবিআর রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর সুস্পষ্ট কোনো নতুন উদ্যোগ ছাড়াই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিল। এর আগে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা দুবার কমিয়েও ৪২ হাজার কোটি টাকা কম আদায় করেছিল।
কোন খাতে কত বাড়লো?
নতুন ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিভাজন নিম্নরূপ:
কাস্টমস শুল্ক (আমদানি-রপ্তানি): লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ১৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা (নতুন লক্ষ্য: ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা)।
স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট (VAT): লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা (নতুন লক্ষ্য: ২ লাখ ৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা)।
আয়কর (Income Tax): লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা (নতুন লক্ষ্য: ২ লাখ ৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা)।