দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বাড়াতে এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার জেটি নির্মাণ প্রকল্পে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের কাজ গত প্রায় দুই বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড’ বর্তমান সংকট কাটিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার ব্যাপারে আশাবাদী।
উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা ও বর্তমান বাস্তবতা
২০১৮ সালে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল বছরে অন্তত এক লাখ ‘Container Handling’ (কন্টেইনার হ্যান্ডলিং) সক্ষমতা অর্জন করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২২ একর জমির ওপর দুটি অত্যাধুনিক জেটি, একটি সুবিশাল কন্টেইনার ইয়ার্ড, ফুয়েল স্টেশন, মাল্টিপারপাস ভবন ও ওয়ার্কশপসহ মোট সাতটি অবকাঠামো নির্মাণের কথা ছিল।
তবে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই থমকে যায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি বা ফিজিক্যাল প্রোগ্রেস দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে। এরপর থেকে নির্মাণস্থলে কোনো কর্মচাঞ্চল্য নেই বললেই চলে। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন প্রকল্পের খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীর ভাষ্য
প্রকল্পের এই দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজার মো. মাকরুজ্জামান বলেন, “জেটি নির্মাণ প্রকল্পের ৬২ শতাংশ কাজ ইতিপূর্বেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে বেশ কিছুদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে কাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বা ‘Communication’ বজায় রাখছি। তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে, খুব দ্রুতই পুনরায় কাজ শুরু হবে। এই জেটিগুলোর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে মোংলা বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড বর্তমান অচলাবস্থার জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেছে। কোম্পানির পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, “এটি আমাদের প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট। বিশ্বব্যাপী চলমান ‘Global Economic Recession’ বা অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আমাদের কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে আশার কথা হলো, ভৌত অবকাঠামোর বড় অংশের বিনিয়োগ আমরা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করেছি। অনেকগুলো ভবনের নির্মাণ কাজ শেষের পথে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা বন্দরের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে এবং দ্রুত অপারেশনে ফিরতে মুখিয়ে আছি। আশা করছি, বর্তমান আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আমরা দ্রুতই পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারব। সংশোধিত সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যেই আমরা প্রকল্প হস্তান্তর করতে সক্ষম হব।”
অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয় অর্থনীতি এবং বন্দরের সামগ্রিক ‘Supply Chain’ (সরবরাহ চেইন) ব্যবস্থায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক খান মেহেদী হাসান এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, “টানা প্রায় দুই বছর ধরে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকা মোটেও ইতিবাচক লক্ষণ নয়। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে যে আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এই বিলম্ব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জটিলতা নিরসন না হলে বন্দরের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।”
চুক্তির শর্ত ও ভবিষ্যৎ
উল্লেখ্য, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের নির্মাণকাল ধরা হয়েছিল দুই বছর। এরপর পরবর্তী ২৮ বছর ‘Operation’ বা পরিচালনা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকার কথা। কিন্তু নির্মাণে এই দীর্ঘ বিলম্ব এখন পুরো চুক্তির সময়সীমা এবং বন্দরের রাজস্ব আয়ের ওপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ২০২৬ সালের নতুন সময়সীমার মধ্যে আদৌ এই মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ করে মোংলা বন্দর তার কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারে কি না।