সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার দাঁত ব্রাশ করেই আমরা ভাবি দায়িত্ব শেষ। কিন্তু সারাদিন যে বিচিত্র ধরনের খাবার আমরা গ্রহণ করি, তা আমাদের দাঁত ও মাড়ির ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তার খবর কি আমরা রাখি? আধুনিক জীবনযাত্রা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং ‘Oral Hygiene’ বা মুখগহ্বরের সঠিক যত্নের অভাবে দাঁতের সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। দন্তবিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতের ব্যথায় কাবু হওয়ার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললেই এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
খাদ্যাভ্যাস ও দাঁতের নীরব ক্ষতি
দন্তচিকিৎসকরা বলছেন, দাঁতের যাবতীয় সমস্যার মূল সূত্রপাত হয় দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা বা ‘Food Particles’ থেকে। বর্তমান সময়ে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ‘Processed Food’ বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং প্রিজারভেটিভযুক্ত খাদ্যের পরিমাণ বেড়েছে। এসব খাবারে থাকে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি বা ‘Artificial Sugar’। এই চিনি খুব দ্রুত দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে ক্যাভিটি বা গর্ত তৈরি করে।
যাদের অতিরিক্ত কফি পানের অভ্যাস রয়েছে, তাদের দাঁতে দ্রুত দাগ পড়ে এবং এনামেল ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। মনে রাখবেন, আমাদের দাঁতের ‘Structure’ বা গঠন পুরোপুরি সমতল নয়; এর মধ্যে অনেক ভাঁজ ও ফাঁক রয়েছে। স্টার্চ বা শর্করাজাতীয় খাবার ও মিষ্টি খাওয়ার পর তা দাঁতের এই ফাঁকগুলোতে জমে একটি পাতলা আঠালো স্তর তৈরি করে, যাকে চিকিৎসাবিদ্যায় ‘Plaque’ বলা হয়। সাধারণ ব্রাশে এই স্তরটি সহজে পরিষ্কার হয় না, আর এখান থেকেই শুরু হয় দাঁতের ক্ষয়।
বিপদ সংকেত: কখন বুঝবেন সমস্যা হচ্ছে?
দাঁতের সমস্যা মানেই যে সব সময় ব্যথা হবে, তা নয়। কিছু নীরব লক্ষণ বা ‘Symptoms’ দেখে আপনাকে বুঝে নিতে হবে যে দাঁতের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে:
নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ: এটি মাড়ি বা দাঁতের ইনফেকশনের প্রাথমিক লক্ষণ।
মাড়ি থেকে রক্তপাত: ব্রাশ করার সময় বা শক্ত কিছু খাওয়ার সময় মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া ‘Gingivitis’ বা মাড়ির রোগের লক্ষণ হতে পারে।
দাঁত নড়ে যাওয়া: দাঁতের গোড়া আলগা হয়ে যাওয়া বা খাওয়ার সময় দুই দাঁতের ফাঁকে খাবার ঢুকে যাওয়া মোটেও সুস্থতার লক্ষণ নয়।
শিরশিরানি বা Sensitivity: ঠান্ডা পানি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে যদি দাঁতে তীব্র শিরশিরানি অনুভূত হয়, তবে বুঝতে হবে এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, সমস্যা থাক বা না থাক, প্রতি তিন মাস অন্তর একজন ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া বা ‘Routine Checkup’ করানো জরুরি। এতে বড় কোনো বিপদ হওয়ার আগেই সতর্ক হওয়া যায়।
প্রতিকার ও সঠিক যত্ন
দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখতে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা আবশ্যক। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচে কিছু গাইডলাইন দেওয়া হলো:
১. খাদ্যাভ্যাসে রাশ টানুন: ‘Fast Food’ বা জাঙ্ক ফুডের প্রতি আকর্ষণ কমাতে হবে। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এবং স্টার্চ জাতীয় খাবার (যেমন- চিপস, বিস্কুট) খাওয়ার পর অবশ্যই ভালো করে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে দিনে দুবার ব্রাশ করার পাশাপাশি ফ্লসিং করার অভ্যাস গড়ুন।
২. ব্রাশ ও সঠিক পদ্ধতি: অনেকেই মাসের পর মাস একই টুথব্রাশ ব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্রাশ ২০ দিন থেকে এক মাসের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। এছাড়া ব্রাশ করার সময় খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করা যাবে না, এতে এনামেল উঠে যেতে পারে। আবার খুব হালকা চাপও কাজের নয়। নরম ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ ব্যবহার করুন যা দাঁতের ফাঁকে পৌঁছাতে পারে।
৩. বর্জন করুন তামাক ও অ্যালকোহল: আপনি দাঁতের যতই যত্ন নিন না কেন, যদি তামাক বা জর্দা সেবনের অভ্যাস থাকে, তবে কোনো লাভ হবে না। ধূমপান এবং মদ্যপান দাঁতের মাড়ির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং দাঁতের গোড়া দুর্বল করে দেয়।
৪. শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা: শিশুদের দাঁতে গঠনগত কোনো ত্রুটি বা ক্যাভিটি দেখা দিলে অবহেলা করবেন না। শৈশবেই সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করলে ভবিষ্যতে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
৫. ঘরোয়া টোটকা: প্রতিদিন অন্তত একবার একটি লবঙ্গ বা ‘Clove’ মুখে রাখতে পারেন। লবঙ্গের প্রাকৃতিক উপাদান মুখের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি এর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ ছোটখাটো সংক্রমণ ও ব্যথা উপশমে সাহায্য করে।