রাতের নিস্তব্ধতা। পাশে হয়তো সঙ্গী নাক ডাকছেন, কিংবা সারাদিনের ক্লান্তির পরেও চোখের পাতায় ঘুমের দেখা নেই। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই স্মার্টফোনটি হাতে নিয়ে কানে ‘হেডফোন’ বা ‘ইয়ারফোন’ গুঁজে দেন। মৃদু লয়ে পছন্দের গান শুনতে শুনতে তলিয়ে যান ঘুমের দেশে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি নিরীহ অভ্যাস মনে হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। আপনার এই সাময়িক প্রশান্তি ভবিষ্যতে ডেকে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদী এবং অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে যারা সারা রাত কানে হেডফোন লাগিয়ে রাখেন, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
শব্দের তীব্রতা ও শ্রবণশক্তির অবক্ষয়
হেডফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রধান যে বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসকরা সতর্ক করেন, তা হলো ‘ভলিয়ম’ বা শব্দের তীব্রতা। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত সহনীয় মাত্রায় বা ‘সেফ ভলিয়ম লেভেল’-এ গান শুনছেন, ততক্ষণ ঝুঁকি কিছুটা কম। কিন্তু ঘুমের মধ্যে ভলিয়মের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দীর্ঘ সময় ধরে কানের খুব কাছে উচ্চ শব্দে গান বাজলে অন্তঃকর্ণের সংবেদনশীল লোমকূপগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক এবং কান বিশ্রামের মোডে থাকে। এ সময় একটানা শব্দ কানের স্নায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে সাময়িক বধিরতা থেকে শুরু করে ‘পার্মানেন্ট হিয়ারিং লস’ বা স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া, অতিরিক্ত জোরে গান শোনার ফলে পারিপার্শ্বিক জরুরি শব্দ (যেমন অ্যালার্ম বা বিপদের সংকেত) শোনার ক্ষমতাও হ্রাস পায়, যা নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র ও ইনফেকশন
অনেকেই দিনের বেলা কাজের ফাঁকে গান শোনেন এবং রাতেও সেই একই ‘ইয়ারবাড’ কানে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ কানে হেডফোন বা ইয়ারফোন গুঁজে রাখার ফলে কানের ভেতরে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এতে কানের ভেতরের পরিবেশ আর্দ্র হয়ে ওঠে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
এই বদ্ধ, উষ্ণ এবং আর্দ্র পরিবেশটি ‘ব্যাকটেরিয়া’ ও ‘ফাঙ্গাস’ জন্মানোর জন্য আদর্শ। দীর্ঘ সময় কান বন্ধ থাকার ফলে সেখানে জীবাণুর সংক্রমণ বা ‘ইয়ার ইনফেকশন’ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে কানে প্রচণ্ড ব্যথা, পুঁজ জমাসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ইয়ার ওয়াক্স বা কানের ময়লা জমে জটিলতা
মানবদেহের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো ‘ইয়ার ওয়াক্স’ বা কানের খোল তৈরি হওয়া, যা কানকে সুরক্ষিত রাখে এবং প্রাকৃতিকভাবেই বাইরে বেরিয়ে আসে। কিন্তু সারারাত কানে ‘ইন-ইয়ার’ হেডফোন বা বাডস লাগিয়ে রাখলে এই স্বাভাবিক নির্গমন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
হেডফোনের চাপে কানের ময়লা আরও ভেতরের দিকে চলে যায় এবং সেখানে শক্ত হয়ে জমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইয়ার ওয়াক্স ইমপ্যাকশন’। এর ফলে কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়া (টিনিটাস), কানে কম শোনা এবং ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে।
সতর্কতা ও করণীয়
প্রযুক্তির এই যুগে হেডফোন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা জরুরি। ঘুমের সময় হেডফোন পরিহার করাই শ্রেয়। যদি গান শুনতেই হয়, তবে ‘টাইমার’ সেট করে রাখা উচিত যাতে নির্দিষ্ট সময় পর গান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ‘ইয়ারবাড’-এর পরিবর্তে ছোট ‘ব্লুটুথ স্পিকার’ ব্যবহার করা কানের স্বাস্থ্যের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। মনে রাখবেন, আজকের সামান্য অসতর্কতা আপনার শ্রবণশক্তিকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।