মানবদেহের গলার সম্মুখভাগে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির ক্ষুদ্র একটি গ্রন্থি থাইরয়েড। শরীরের বিপাক ক্রিয়া বা ‘মেটাবলিজম’ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা অপরিসীম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে, এমনকি বাংলাদেশেও থাইরয়েড ক্যানসারের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় এতটাই নিঃশব্দে বা ‘সাইলেন্টলি’ শরীরে বাসা বাঁধে যে, রোগীরা প্রায়শই এর লক্ষণগুলো অবহেলা করেন। অথচ, প্রাথমিক পর্যায়ে বা ‘আর্লি স্টেজ’-এ ধরা পড়লে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
থাইরয়েড ক্যানসার সাধারণত শুরুতে কোনো ব্যথাবেদনা তৈরি করে না। তবে শরীরের কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন বা ‘ওয়ার্নিং সাইন’ দেখে সতর্ক হওয়া জরুরি। এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নির্দেশিত ৫টি প্রধান লক্ষণ তুলে ধরা হলো, যা দেখা দিলেই কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
১. গলায় অস্বাভাবিক গুটি বা স্ফীতি (Thyroid Nodule)
থাইরয়েড ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো গলার সামনের দিকে, বিশেষ করে থাইরয়েড গ্রন্থির আশেপাশে কোনো শক্ত গুটি বা পিণ্ড অনুভব করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘থাইরয়েড নোডিউল’ বলা হয়। সাধারণ ইনফেকশনের কারণে হওয়া ফোলা ভাব সাধারণত নরম হয় এবং ব্যথা থাকে। কিন্তু ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই গুটি সাধারণত শক্ত হয় এবং চাপ দিলে সহজে নড়াচড়া করে না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঢোক গেলা বা পানি পানের সময় গলার এই অংশে কোনো অস্বাভাবিকতা নজরে এলে সতর্ক হতে হবে।
২. কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন বা দীর্ঘস্থায়ী স্বরভঙ্গ
ঠান্ডা বা সর্দি-কাশি ছাড়াই যদি হঠাৎ গলার স্বর বসে যায় বা কর্কশ হয়ে যায়, তবে তা চিন্তার বিষয়। ক্যানসার আক্রান্ত টিউমারটি যখন গলার ‘ভোকাল কর্ড’ বা স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন ভয়েস বা কণ্ঠস্বরে এই পরিবর্তন আসে। যদি কোনো কারণ ছাড়াই দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আপনার কণ্ঠস্বর ভাঙা থাকে, তবে এটি সাধারণ ল্যারিঞ্জাইটিস নয়, বরং আরও গভীর কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. খাবার বা পানি গিলতে অসুবিধা (Dysphagia)
খাবার বা পানি গেলার সময় যদি মনে হয় গলায় কিছু আটকে আছে বা ব্যথা অনুভূত হয়, তবে একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ডিসফ্যাজিয়া’ বলা হয়। থাইরয়েড গ্রন্থিটি বড় হয়ে খাদ্যনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে এই সমস্যা দেখা দেয়। শুরুতে কেবল শক্ত খাবার গিলতে কষ্ট হলেও, ধীরে ধীরে পানি পানেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এই লক্ষণটি দেখা দিলে দ্রুত ‘আল্ট্রাসোনোগ্রাম’ বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
৪. শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসনালিতে চাপ অনুভব
থাইরয়েড টিউমার বা গ্ল্যান্ডটি যখন অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে শ্বাসনালির (Trachea) ওপর চাপ প্রয়োগ করে, তখন শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। অনেক সময় শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় বা চিৎ হয়ে শুলে যদি শ্বাসকষ্ট বা গলার নিচের দিকে ভারি ভাব অনুভব করেন, তবে এটি থাইরয়েড ক্যানসারের অগ্রবর্তী ধাপের লক্ষণ হতে পারে।
৫. কান ও গলার সংযোগস্থলে ব্যথা
সাধারণত আমরা গলার ব্যথাকে টনসিল বা ভাইরাল ফিভারের লক্ষণ মনে করি। কিন্তু থাইরয়েড ক্যানসারের ক্ষেত্রে গলার সামনের অংশের ব্যথা ঘাড় হয়ে কানের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি দীর্ঘমেয়াদী গলার ব্যথার সঙ্গে কানেও ভোঁতা ব্যথা অনুভূত হয় এবং অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ না হয়, তবে এটি ‘রেফার্ড পেইন’ হতে পারে, যা ক্যানসারের অন্যতম উপসর্গ।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে?
শরীরে কোনো লক্ষণই বিনা কারণে স্থায়ী হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়ের কিছু নেই, তবে সচেতনতাই আসল সুরক্ষা। নিচের পরিস্থিতিগুলোতে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ বা অনকোলজিস্টের পরামর্শ নিন:
উপরে উল্লিখিত যেকোনো লক্ষণ যদি ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়।
গলার কোনো গুটি বা মাংসপিণ্ড যদি দ্রুত বড় হতে থাকে।
পরিবারে যদি আগে কারও থাইরয়েড ক্যানসার বা অন্য কোনো ‘ম্যালিগন্যান্সি’র ইতিহাস (Family History) থাকে।
গলায় কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই সারাক্ষণ চাপ বা অস্বস্তি অনুভূত হলে।
মনে রাখবেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে থাইরয়েড ক্যানসারের সফল চিকিৎসা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক সময়ে রোগটি শনাক্ত করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা।