ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ফের চরম আকার ধারণ করেছে। পাকিস্তানের ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশের জন্য খোদ আফগান সীমান্তরক্ষী বাহিনীকেই দায়ী করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (ISPR) সরাসরি অভিযোগ তুলেছে যে, সীমান্তে পাকিস্তানি চেকপোস্ট লক্ষ্য করে আফগান বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলি বা ‘কভার ফায়ার’-এর সুযোগ নিয়েই সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এই বিস্ফোরক অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে আবারও খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
অনুপ্রবেশের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ ও আইএসপিআরের দাবি
গত মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র ও আইএসপিআর-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এই গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) আইএসপিআর কর্তৃক প্রকাশিত ওই ব্রিফিংয়ের ভিডিওতে জেনারেল চৌধুরী দাবি করেন, সীমান্তের ওপারে থাকা আফগান বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তানি পোস্টগুলো লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
তিনি বলেন, “সীমান্ত সুরক্ষা সাধারণত দুই দেশের যৌথ দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অপর পাশে এমন একটি দেশ রয়েছে যাদের পোস্টগুলো প্রথমে আমাদের ওপর গুলি চালায় এবং একটি ‘ক্রস ফায়ার’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা সন্ত্রাসীদের সীমান্ত পার করে দেয়।”
সীমান্ত সুরক্ষা ও আধুনিক নজরদারির অভাব
কেবল কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মনে করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। আইএসপিআর ডিজির মতে, কঠোর ‘সারভাইলেন্স’ বা নজরদারি না থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব। কার্যকর ‘বর্ডার কন্ট্রোল’ নিশ্চিত করতে তিনি আধুনিক প্রযুক্তির ওপর জোর দেন। তার মতে, প্রতি কয়েক কিলোমিটার পরপর সুরক্ষিত পোস্ট, বিশাল জনবল বা ম্যানপাওয়ার এবং নিরবচ্ছিন্ন ‘ড্রোন সার্ভিলেন্স’ (Drone Surveillance) ছাড়া এই দুর্গম সীমান্তে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও দোহা আলোচনা
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরও আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান সম্পর্ক নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো ‘ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধবিরতি’ (Traditional Ceasefire) নয়। বরং এটি পুরোপুরি নির্ভর করছে আফগান মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হচ্ছে কি না, তার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ (TTP) এবং বেলুচিস্তানে ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (BLA)-এর হামলার তীব্রতা বেড়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, তালেবান সরকার এই গোষ্ঠীগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই দ্বন্দের জেরে গত ১১ অক্টোবর ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাক-আফগান সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় দোহায় দুই দফা আলোচনার পর একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, তৃতীয় দফার আলোচনায় কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আসেনি। যদিও উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে।
খোস্ত প্রদেশে হামলা ও পাল্টা হুমকি
পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে চলতি সপ্তাহে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কথিত হামলার ঘটনায়। আফগান কর্তৃপক্ষের দাবি, গত সোমবার গভীর রাতে আফগানিস্তানের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় একটি বাড়িতে থাকা অন্তত ৯টি শিশু ও একজন নারী নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর আফগান তালেবান সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং পাকিস্তানের ওপর এই হামলার ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। সব মিলিয়ে, সীমান্ত সংঘাত, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।