ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। চলমান দুর্নীতির বিচারপ্রক্রিয়া এড়াতে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্ষমা’ (Pardon) প্রার্থনা করলেন তিনি। রোববার (৩০ নভেম্বর) ইসরাইলের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সুপারিশের পরপরই নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
ট্রাম্পের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ও রাজনৈতিক সমীকরণ
নেতানিয়াহুর এই আবেদন আকস্মিক নয়, বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক দাবার চাল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত। চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরাইল সফরে এসে ট্রাম্প দেশটির পার্লামেন্ট ‘Knesset’-এ দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করার জন্য প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, নভেম্বরের শুরুতে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিও পান প্রেসিডেন্ট হার্জোগ, যেখানে নেতানিয়াহুর ‘Pardon’ বা ক্ষমার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার অনুরোধ করা হয়। ট্রাম্পের সেই কূটনৈতিক চাপের পরই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন নেতানিয়াহু।
কী অভিযোগ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে?
ইসরাইলের ইতিহাসে নেতানিয়াহুই একমাত্র ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী, যিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১৯ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তিনটি পৃথক হাই-প্রোফাইল মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘুষ গ্রহণ (Bribery), জালিয়াতি (Fraud) এবং বিশ্বাসভঙ্গ (Breach of Trust)। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর যখন নিজের অবস্থান নড়বড়ে হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতার আশ্রয় নিলেন তিনি।
প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া ও আইনি জটিলতা
নেতানিয়াহুর এই আবেদন ইসরাইলের বিচার ব্যবস্থায় বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুরোধ রাষ্ট্রপতির কাছে এসেছে। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত এবং আইনি দিক পর্যালোচনা করে প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এই অনুরোধ বিবেচনা করবেন।”
আন্তর্জাতিক চাপ ও আইসিসির খড়গ
নেতানিয়াহুর সামনে বিপদ কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঘনীভূত হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধাপরাধ (War Crimes) এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) নেতানিয়াহুকে খুঁজছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (Arrest Warrant) জারি করে।
একদিকে আন্তর্জাতিক আদালতের পরোয়ানা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতির বিচার—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন ইসরাইলি এই ‘Strongman’। এখন দেখার বিষয়, প্রেসিডেন্ট হার্জোগ শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কিত ক্ষমার আবেদনে সাড়া দেন কি না।