• জাতীয়
  • সামরিক বাহিনীতে ‘বৈষম্য-নিপীড়ন কল্পনারও বাইরে’: ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের

সামরিক বাহিনীতে ‘বৈষম্য-নিপীড়ন কল্পনারও বাইরে’: ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
সামরিক বাহিনীতে ‘বৈষম্য-নিপীড়ন কল্পনারও বাইরে’: ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের

প্রতিবেদনে উঠে এল গুম, হত্যা, মিথ্যা অভিযোগে বরখাস্ত ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র; কমিটি কর্তৃক ১১৪ অফিসারের ক্ষেত্রে সুপারিশ পেশ।

কমিটি কর্তৃক প্রতিবেদন হস্তান্তর ও প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্য

বিগত ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অসংখ্য সামরিক সদস্যের প্রতি অন্যায়ভাবে সংঘটিত বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার (Persecution) পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে।

রোববার (৩০ নভেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার নিকট এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রফেসর ইউনূস মন্তব্য করেন যে, বিগত সরকারের আমলে অন্যায়ভাবে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হওয়া অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো বঞ্চিত সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও ন্যায়বিচার (Justice) নিশ্চিত করবে সরকার।

প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, "যখন আপনাদেরকে এই কাজটি করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিল সামান্য কিছু অনিয়ম হয়ত হয়েছে, কিন্তু আপনারা যে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে এনেছেন তা রীতিমতো ভয়াবহ। এটা কল্পনার একেবারে বাইরে।" পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও নির্মোহ অবস্থান থেকে সত্য বের করে আনায় তিনি কমিটির সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।

এই কমিটি গঠিত হয়েছিল বিগত সরকারের সময়ে চাকরিতে বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত অফিসারদের আবেদন পর্যালোচনাপূর্বক যথাবিহিত সুপারিশ পেশের জন্য। কমিটির সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

৭৩৩ অভিযোগের অ্যানালাইসিস: রেকর্ড ও ডেটা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিটি সামরিক সদস্যদের কাছ থেকে সর্বমোট ৭৩৩টি অভিযোগের আবেদন পায়। এর মধ্যে ৪০৫টি অভিযোগ কমিটি কর্তৃক গৃহীত হয়। কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত আবেদনের সংখ্যা ১১৪টি। এছাড়া, ২৪টি আবেদন কমিটির কার্যপরিধির আওতা বহির্ভূত ছিল এবং ৯৯টির আবেদনকারীর ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গের, সাজা মওকুফের ও নৈতিক স্খলনজনিত বিষয় রয়েছে।

জেনারেল আব্দুল হাফিজ জানান, আবেদনপত্র পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটি গত ১৯ আগস্ট প্রথম সভা আহ্বান করে। বঞ্চিত অফিসারদের সেন্ট্রাল অফিসার্স রেকর্ড অফিস (CORO), আইএসপিআর ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়ার মাধ্যমে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজের মাধ্যমে ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি উল্লেখ করেন, যে অফিসারদের বিষয়ে নিজ নিজ বাহিনী কর্তৃক গঠিত বোর্ড পূর্বে সুপারিশ প্রদান করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো নৈতিক স্খলনজনিত শাস্তি কিংবা অভিযোগ ডোসিয়ারে লিপিবদ্ধ ছিল না।

কমিটি ভুক্তভোগী অফিসারদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অধিনায়ক ও ঊর্ধ্বতন অফিসারদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের বঞ্চনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।

ভয়াবহ চিত্র: গুম, হত্যা ও মিথ্যা মামলা

কমিটির অনুসন্ধানে কিছু নজিরবিহীন ও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:

গুম ও অবৈধ আটক: কমিটির অনুসন্ধানে জানা যায়, ৬ জন কর্মকর্তাকে তাদের আত্মীয়-স্বজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দরুন বা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অপবাদ দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিভিন্ন মেয়াদে (১ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত) গুম করে রাখা হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

হত্যা ও নির্যাতন: এমনকি একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসারকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত অফিসারের স্ত্রীকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক বছরের শিশুসহ বিনা বিচারে দুই দফায় দীর্ঘ ছয় বছর কারাগারে রাখা হয়।

বিডিআর বিদ্রোহের জের: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় সোচ্চার ৫ জন কর্মকর্তাকে একটি ভুয়া ঘটনা (ব্যারিস্টার তাপস হত্যা প্রচেষ্টা মামলা) সাজিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়।

ডিজিএফআই সংশ্লিষ্টতা: ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকাকালীন ৫ জন কর্মকর্তাকে মিথ্যা অভিযোগে কিংবা বিনা অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

ধর্মীয় আচারের অপবাদ: ৪ জন কনিষ্ঠ অফিসারকে (লেফটেন্যান্ট পদবির) ধর্মীয় আচার-আচরণ নিয়ম-নিষ্ঠার সাথে পালন করার কারণে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

তদন্তে আরও দেখা যায়, মোট ২৮ জন বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ সত্ত্বেও গুম, অপহরণ, অবৈধভাবে আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন, লোক দেখানো প্রহসনের তদন্ত ও বিচারহীন, আইন-বহির্ভূত কার্যকলাপের শিকার হয়েছেন।

কমিটি কর্তৃক সুপারিশ ও ন্যায়বিচারের পথ

কমিটির প্রতিবেদনে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখার বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হওয়া মোট ১১৪ জন কর্মকর্তার বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। এই সুপারিশগুলো নিম্নরূপ:

সেনাবাহিনী (Army): বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১১৪ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে (যার জন্য যা প্রযোজ্য) স্বাভাবিক অবসর প্রদান, পদোন্নতি, অবসর-পূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানের জন্য কমিটি সুপারিশ করে। এর মধ্যে ৪ জনকে চাকুরিতে পুনঃবহাল করার জন্যও সুপারিশ করা হয়।

নৌবাহিনী (Navy): বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১৯ কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর, পদোন্নতি, অবসরপূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানের জন্য কমিটি সুপারিশ করে।

বিমানবাহিনী (Air Force): বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১২ কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর, পদোন্নতি, অবসর পূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানের জন্য কমিটি সুপারিশ করে।

মোট আবেদনকারীদের মধ্যে ১২৫ জন সেনা, ৫১ জন নৌ ও ২৫ জন বিমানবাহিনীর সদস্য ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস নিশ্চিত করেছেন যে, তার সরকার এসব সামরিক সদস্যদের বঞ্চনার ইস্যুটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং ন্যায়বিচারের সুনিশ্চিতি প্রদান করবে।