জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal)। বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ১০ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
বুধবার (০৩ ডিসেম্বর) কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। আলোচিত এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে আজ ‘Charge Framing’ বা অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শুনানিকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্য।
কাঠগড়ায় র্যাবের সাবেক শীর্ষ কর্তারা
বুধবার সকালে প্রিজন ভ্যানে করে অভিযুক্ত ১০ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। এদের অধিকাংশই এলিট ফোর্স র্যাবের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধীদের দমন করতে গুম এবং ‘Crossfire’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালে হাজির করা এই ১০ কর্মকর্তা হলেন: র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (যিনি বর্তমানে অবসরকালীন ছুটিতে আছেন), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
পলাতক আসামিদের স্ট্যাটাস ও স্টেট ডিফেন্স
এই মামলার ‘High-profile’ আসামিদের অনেকেই বর্তমানে পলাতক বা ‘Fugitive’ অবস্থায় রয়েছেন। পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন এবং সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ।
এর আগে গত ২৩ নভেম্বর মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল। পলাতক আসামিরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে ‘State Defense’ বা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। আজ সেই অভিযোগ গঠনের শুনানি বা ‘Hearing’ শুরু হচ্ছে, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
সমান্তরালে চলছে আশুলিয়া ট্র্যাজেডির বিচার
একই দিনে ট্রাইব্যুনালে জুলাই বিপ্লব চলাকালীন আশুলিয়ায় ৬টি মরদেহ পোড়ানো এবং ৭ জনকে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনার মামলার কার্যক্রমও চলছে। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণের (Testimony) জন্য আজ দ্বিতীয় দিন ধার্য করা হয়েছে।
এদিন এই মামলার গ্রেপ্তারকৃত ৯ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলার অন্যতম আসামি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা শেখ আফজালুল ‘Approver’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেছিলেন এবং তিনি ইতিমধ্যেই জবানবন্দি দিয়েছেন। তার এই জবানবন্দি মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।