শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেছেন, ‘জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগই আমাদের চালিকাশক্তি।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এখনই ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এমন একটি বিসিক (BISIC) দেখতে চাই যা হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং উদ্যোক্তাবান্ধব।
আজ বুধবার (৩ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বার্ষিক সম্মেলন ও কর্মশালা-২০২৫-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রথম দিনে বিসিকের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও তাদের বক্তব্যে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান: নতুন দিগন্তে শিল্পায়নের চালিকাশক্তি
উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান তার বক্তব্যের শুরুতেই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, এই আত্মত্যাগই পরিবর্তিত বাংলাদেশের জন্য আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নযাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার করবে। এই প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের এই সম্মেলন একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ।
তিনি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন প্রজন্মের প্রতি জোর দেন। উপদেষ্টা বলেন, নতুন প্রজন্ম যেন কেবল চাকরির (Job) পেছনে না ছুটে, বরং তারা যেন উদ্যোক্তা (Entrepreneur) হতে পারে। এজন্য প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একইসঙ্গে, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিসিকের গৃহীত কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তা আরও সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্ষুদ্র শিল্প: গভর্নরের রূপকল্প
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট সেক্টর-এর (International Payment Sector) সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষভাবে ফোকাস করছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এখন সরাসরি পণ্য কেনা অনেক বেড়ে গেছে, তারা সেখানে বসেই চায়না থেকে পণ্য কিনে নিচ্ছে। তাহলে আমাদের জামদানি কেন বিদেশ থেকে কিনতে পারবে না!’ গভর্নর উল্লেখ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি (Job Creation), উৎপাদন বিস্তার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি (Inclusive Growth) ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি খাত অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিসিক প্রশিক্ষণ, ঋণ সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা (Technological Capability) বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
৬৯ বছরের বিসিক: অর্জন ও ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা
বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম তার স্বাগত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশের শিল্পায়নের বাস্তব রূপ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ৬৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান দেশব্যাপী শিল্প বিকাশে নিরলসভাবে কাজ করছে এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে নিজেদের সর্বোচ্চ অবদান রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা জানান। এর মধ্যে অন্যতম হলো: পরিবেশবান্ধব নতুন শিল্পনগরী বা শিল্প পার্ক (Industrial Park) স্থাপন; শিল্পনগরীর অনাবাদি প্লটগুলোর শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা; এবং আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মৌচাষ উন্নয়নসহ বিসিকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা (Institutional Capacity) বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে '৬৯ বছরে বিসিক: অর্জন, সমস্যা ও সম্ভাবনা' শীর্ষক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় বিসিকের নানা কার্যক্রমের প্রসঙ্গ উঠে আসে এবং অংশগ্রহণকারীরা তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।