মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো পাকস্থলী বা ‘স্টমাক’ (Stomach)। খাদ্য হজম থেকে শুরু করে শরীরে শক্তি জোগান দেওয়া—সবই নির্ভর করে এই অঙ্গটির সুস্থতার ওপর। তবে বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে পাকস্থলীতে বাসা বাঁধছে মারণরোগ ক্যান্সার। বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণগুলোর মধ্যে এটি একটি।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, পাকস্থলীর টিস্যু তৈরি করা কোষের ‘ডিএনএ’ (DNA)-তে যখন কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা ‘মিউটেশন’ (Mutation) ঘটে, তখনই ক্যান্সারের সূচনা হয়। এই মিউটেশনের ফলে কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে এবং সুস্থ কোষগুলোকে মেরে ফেলে ‘টিউমার’ (Tumor) গঠন করে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় এর লক্ষণ বোঝা যায় না, যা একে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এখনও পর্যন্ত পাকস্থলী ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট একটি কারণ চিহ্নিত করা না গেলেও, সাম্প্রতিক গবেষণা এবং চিকিৎসকদের মতে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কিছু অভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থাই এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জেনে নিন এমন ৭টি কারণ, যা পাকস্থলী ক্যান্সারের জন্য দায়ী হতে পারে।
১. গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)
অনেকেই বুকজ্বালা বা টক ঢেকুরকে সাধারণ অ্যাসিডিটি ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি ‘গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ’ বা GERD-এর লক্ষণ হতে পারে। এই অবস্থায় খাদ্যনালী বা ‘ইসোফেগাস’-এর (Esophagus) শেষ প্রান্তে থাকা ভালভ বা পেশি ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে পাকস্থলীর অ্যাসিড ওপরের দিকে উঠে আসে। দীর্ঘমেয়াদি এই সমস্যা খাদ্যনালীর কোষের ক্ষতি করে এবং ভবিষ্যতে পাকস্থলী ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে।
২. পাতে অতিরিক্ত নোনতা ও ধোয়াযুক্ত খাবার
খাবারের স্বাদ বাড়াতে অনেকেই অতিরিক্ত লবণ বা ‘সল্টেড ফুড’ পছন্দ করেন। এছাড়া স্মোকড বা ধোয়াযুক্ত খাবার (যেমন—স্মোকড মিট বা ফিশ) খাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহৃত প্রিজারভেটিভ এবং অতিরিক্ত সোডিয়াম পাকস্থলীর আস্তরণের ক্ষতি করে। দীর্ঘদিনের এই খাদ্যাভ্যাস ক্যান্সারের কোষ গঠনে সহায়তা করতে পারে।
৩. স্থূলতা বা ওবেসিটি
শরীরের বাড়তি ওজন বা ‘ওবেসিটি’ (Obesity) শুধুমাত্র হার্ট বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় না, এটি পাকস্থলী ক্যান্সারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতিরিক্ত চর্বি শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ‘ইনফ্লেমেশন’ তৈরি করে, যা পেটের ওপরের অংশে ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
৪. শাক-সবজি ও ফলের ঘাটতি
আজকাল ফাস্টফুডের যুগে মানুষের ডায়েট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে টাটকা শাক-সবজি ও ফলমূল। অথচ এই প্রাকৃতিক খাবারগুলোতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং ভিটামিন, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করে। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফল ও সবজির অভাব পরোক্ষভাবে ক্যান্সারের পথ প্রশস্ত করে।
৫. দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রিক বা পেটের প্রদাহ
যাদের পেটে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ‘ক্রনিক গ্যাস্ট্রাইটিস’ (Chronic Gastritis) রয়েছে, তাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। পেটের আলসার বা এইচ. পাইলোরি (H. pylori) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যদি দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে, তবে তা পাকস্থলীর ভেতরের স্তরে পরিবর্তন আনতে পারে, যা কালক্রমে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
৬. ধূমপানের মারণ নেশা
ফুসফুসের পাশাপাশি পাকস্থলীর জন্যও সমান ক্ষতিকর ধূমপান। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ‘কার্সিনোজেন’ (Carcinogen) শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। নিয়মিত ধূমপায়ীদের পাকস্থলীর উপরের অংশে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
৭. পারিবারিক ইতিহাস বা জেনেটিক্স
ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি হিস্ট্রি’ বা পারিবারিক ইতিহাস একটি বড় ফ্যাক্টর। পরিবারের ঘনিষ্ঠ কোনো সদস্যের (বাবা, মা বা ভাই-বোন) যদি অতীতে পাকস্থলী ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তবে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এই রোগের ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে নিয়মিত হেলথ চেকআপ বা ‘স্ক্রিনিং’ করানো জরুরি।