দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় অচলাবস্থা নিরসনে সরকার ও শিক্ষকদের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে এক নাটকীয় মোড় নিল আন্দোলন। প্রাথমিক শিক্ষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদসহ ৪২ জন শিক্ষককে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বদলির আদেশ জারি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের কয়েক ঘণ্টা পরই অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হওয়া ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বদলি আদেশ: মধ্যরাতের প্রজ্ঞাপনে সরকারের কঠোর বার্তা
আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ‘তিন দফা দাবি আদায় বাস্তবায়ন পরিষদ এবং সংগঠন ঐক্য পরিষদ’-এর মূল সংগঠক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদসহ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ৪২ জন শিক্ষককে মধ্যরাতে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এই বদলিকে আন্দোলনের Leadership-এর ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন শিক্ষক সমাজ। এর আগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় পরিষদের চারজন আহ্বায়কসহ কয়েকজন শিক্ষককে শোকজও করা হয়েছিল।
'নৈতিকতা' ও 'মানবিকতা'র যুক্তিতে সাময়িক স্থগিত
সরকারি কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপের পর প্রাথমিক শিক্ষকদের এই কঠোর কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা আসে। সংগঠন ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক শামসুদ্দিন মাসুদ জানান, নৈতিকতা, মানবিকতা ও শিশু শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রবিবার (রোববার) থেকে সারা দেশে সব শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা (Annual Exam) শুরু হতে চলেছে। এই পরীক্ষার স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে আপাতত পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া না পর্যন্ত শাটডাউন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। তবে এই স্থগিতাদেশকে আন্দোলনের কৌশলগত বিরতি (Strategic Pause) হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষক মহল।
কেন এই শাটডাউন? শিক্ষকদের মূল দাবি ও অভিযোগ
শিক্ষকদের অভিযোগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে ২২ দিন অতিবাহিত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। দাবি পূরণে সরকার উদ্যোগী না হওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে এই কঠোর কর্মসূচিতে যান। দাবি আদায়ে প্রথমে কর্মবিরতি, এরপর বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন এবং সবশেষে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (Complete Shutterdown) কর্মসূচি শুরু করেছিলেন তাঁরা।
বাস্তবায়ন পরিষদের অন্যতম আহ্বায়ক মু. মাহবুবর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, গতকালও শিক্ষকরা সর্বাত্মক কমপ্লিট শাটডাউন করেছেন। দাবি পূরণ করে প্রজ্ঞাপন জারি না করা পর্যন্ত আন্দোলন থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। আরেক আহ্বায়ক খায়রুন নাহার লিপি উল্লেখ করেন, শিক্ষকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তাই কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া মিলেছে।
অভিভাবকদের ক্ষোভ ও কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি
শিক্ষকদের টানা কর্মবিরতি ও তালাবদ্ধ কর্মসূচিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, বছরের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এবং শিশুরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক করার দাবি জানান তাঁরা। দেশের কিছু স্থানে অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ হয়ে স্কুলের তালা ভেঙে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে শিক্ষকদের অবিলম্বে পরীক্ষায় ফেরার চূড়ান্ত নির্দেশ (Final Directive) দেয়। একই সঙ্গে কর্মবিরতি বা শাটডাউন অব্যাহত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। সতর্কবার্তায় বলা হয়, সরকারি চাকরি আইন (Government Service Law), আচরণবিধি (Conduct Rules) এবং ফৌজদারি আইনে (Criminal Law) শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষক নেতারা সরকারের কাছে দ্রুত প্রতিশ্রুত দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে অচলাবস্থা নিরসন করে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।