শরীয়তপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড়সড় চমক। দীর্ঘদিনের পুরোনো হিসেব-নিকেশ পাল্টে দিয়ে বিএনপির পতাকাতলে শামিল হলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা। শরীয়তপুর-৩ (ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট) আসনের ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিলেন ডামুড্যা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিধলকুড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জানে আলম খোকন মাদবর। শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) বিকেলে ঘটা এই রাজনৈতিক পালাবদল বা ‘পলিটিক্যাল শিফট’ (Political Shift) এলাকার নির্বাচনী আবহে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
নৌকার ঘাঁটি এখন ধানের শীষের দুর্গ?
শুক্রবার বিকেলে ডামুড্যা উপজেলার শিধলকুড়া ইউনিয়নের তালতলা এলাকায় জানে আলম খোকন মাদবরের বাড়িতে বসেছিল এক ভিন্নধর্মী আসর। বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন অপু গণসংযোগ বা ‘মাস ক্যাম্পেইন’ (Mass Campaign)-এর অংশ হিসেবে সেখানে পৌঁছালে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া হয়। এরপরই নিজের অনুসারী প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে অপুর গলায় মালা পরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদানের ঘোষণা দেন খোকন।
দলবদলের এই মুহূর্তে আবেগঘন কণ্ঠে খোকন মাদবর বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু সাবেক সাংসদ নাহিম রাজ্জাক আমার জীবনে যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন, তা ভোলার নয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও আমি নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করিনি। আজ মিয়া নুরুদ্দিন অপু ভাই নিজে এসে আমাকে যে সম্মান দিলেন, জীবন দিয়ে হলেও আমি এই সম্মানের মর্যাদা রাখব। এক সময় এই এলাকা নৌকার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন থেকে একে ধানের শীষের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে পরিণত করব।’’
সংঘাত নয়, ঐক্যের ডাক অপুর
সদ্য যোগদান করা নেতাকর্মীদের স্বাগত জানিয়ে মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু বলেন, ‘‘দল-মত নির্বিশেষে আমরা সবাই একটি বৃহত্তর পরিবারের অংশ। অতীতের সব হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে আমাদের সামনে তাকাতে হবে। এই পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ শরীয়তপুর গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।’’ তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে বিভেদ ভুলে ‘ইনক্লুসিভ পলিটিক্স’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির চর্চা করার আহ্বান জানান।
তৃণমূলে ব্যাপক গণসংযোগ ও তারুণ্যের উচ্ছ্বাস
এর আগে দিনের শুরুতেই শিধলকুড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ‘উঠান বৈঠক’ (Courtyard Meeting)-এর মাধ্যমে জনসংযোগ শুরু করেন অপু। ডামুড্যা পৌরসভা থেকে শুরু করে শিধলকুড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও হাট-বাজারে গিয়ে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। জুমার নামাজ শেষে তিনি বিভিন্ন মসজিদে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিলে অংশ নেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচীর বাইরেও এদিন এক অন্যরকম অপুকে দেখল এলাকাবাসী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির পরিদর্শন করে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেন। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের সঙ্গে সেলফি তোলা এবং তাদের হাতে খেলাধুলার সামগ্রী তুলে দিয়ে তিনি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নিজের ‘কানেকশন’ বা সংযোগ আরও দৃঢ় করেন। তিনি বলেন, ‘‘পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাই পারে যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করতে।’’
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বার্তা
গণসংযোগকালে অপু ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘ধানের শীষ কেবল একটি নির্বাচনী প্রতীক নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের হৃত গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দীর্ঘদিন মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আগামী নির্বাচনে সেই বঞ্চনার জবাব দেওয়ার সুযোগ এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে শরীয়তপুর হবে উন্নয়নের রোল মডেল।’’
এ সময় জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এস এম মাহফুজুর রহমান বাচ্চু সরকার, শাহ মো. আব্দুস সালাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান খান দিপুসহ ডামুড্যা উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।