কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল যেন এক রহস্যের খনি। শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) বিকেলে সেই রহস্য ভেদ করেই জেলেদের জালে উঠে এল এক বিশাল আকৃতির শাপলাপাতা মাছ, যার ওজন প্রায় ১৫ মণ! স্থানীয় জেলেদের কাছে ‘সমুদ্রদানব’ খ্যাত এই মাছটি ডাঙ্গায় তোলার পর থেকেই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। স্থানীয় ভাষায় ‘সিং সোয়াইং’ বা ‘পাতা হাঙ্গর’ নামে পরিচিত এই বিরল প্রজাতির মাছটি একনজর দেখতে সাবরাং মুন্ডার ডেইল উপকূলে ভিড় জমায় হাজারো উৎসুক জনতা ও পর্যটক।
সাগরের বুক চিরে ডাঙায় তোলার লড়াই
শুক্রবার বিকেলে সাধারণ দিনের মতোই সাগরে জাল ফেলেছিলেন জেলে আব্দুল গফুর। কিন্তু জালের টান অনুভব করতেই বোঝা যাচ্ছিল, সাধারণ কোনো মাছ আটকা পড়েনি। দীর্ঘক্ষণ কসরত করার পর যখন মাছটি পানির ওপরে ভেসে ওঠে, তখন জেলেদের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। প্রায় ৬০০ কেজি (১৫ মণ) ওজনের এই বিশাল মাছটি ট্রলারে তোলা ছিল অসম্ভব।
জেলে আব্দুল গফুর তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, "জীবনে অনেক মাছ ধরেছি, কিন্তু এমন বিশাল আকৃতির শাপলাপাতা মাছ এই প্রথম দেখলাম। মাছটি এত ভারী ছিল যে, ট্রলারে তোলার সাধ্য ছিল না আমাদের। শেষ পর্যন্ত অন্য জেলেদের সহায়তায় রশি দিয়ে বেঁধে, ট্রলারের সঙ্গে টেনে অনেক কষ্টে এটিকে উপকূলে নিয়ে আসতে হয়েছে।"
গভীর সমুদ্রের অতিথি ও বাস্তুসংস্থান
টেকনাফ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনের মতে, এই মাছটি মূলত Deep Sea বা গভীর সমুদ্রের বাসিন্দা। সাধারণত উপকূলীয় অগভীর জলে এদের দেখা যায় না। ধারণা করা হচ্ছে, জোয়ার-ভাটার প্রবল টানে বা খাদ্যের সন্ধানে মাছটি দিক হারিয়ে উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছিল।
মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, স্থানীয়ভাবে একে ‘সিং সোয়াইং’ বা পাতা হাঙ্গর বলা হলেও, এটি মূলত ‘স্টিংরে’ (Stingray) গোত্রের মাছ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বা Marine Biodiversity-র অংশ হিসেবে এই মাছগুলো সাগরের বাস্তুসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও রপ্তানি বাজারে এর খুব একটা কদর নেই, কিন্তু স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়।
পর্যটকদের ভিড় ও বাণিজ্যিক মূল্য
বিশালদেহী এই মাছটি সাবরাং মুন্ডার ডেইল ফিশিং ঘাটে আনার খবর বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও ভিড় জমান ‘সমুদ্রদানব’ খ্যাত এই প্রাণীটিকে দেখতে। অনেকে মাছটির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি ও সেলফি তুলতেও ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
দর্শকদের কৌতূহলের পাশাপাশি মাছটিকে ঘিরে শুরু হয় বাণিজ্যিক তোড়জোড়। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী নুর আহমদ জানান, এই ধরনের Rare Species-এর মাছ সচরাচর বাজারে দেখা যায় না। শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আলম নামের এক পাইকারি ব্যবসায়ী ৫০ হাজার টাকায় মাছটি কিনে নেন।
সৈয়দ আলম জানান, এই মাছের মূল ক্রেতা রাখাইন সম্প্রদায়। তাদের কাছে শাপলাপাতা মাছের শুঁটকি ও মাংসের ব্যাপক Market Demand রয়েছে। মাছটি কেটে টুকরো করে বরফজাত করার পর তা চট্টগ্রামের বাজারে পাঠানো হবে, যেখানে এটি চড়া দামে বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।