দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান শুধু তার অভিনয় দক্ষতার জন্যই পরিচিত নন, বরং প্রাণিপ্রেমী এবং একজন সক্রিয় ‘অ্যানিমেল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবেও তার রয়েছে আলাদা পরিচিতি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অবলা প্রাণীদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার। গোপালগঞ্জে গত অক্টোবর মাসে কুকুর নিধনের নির্মম অভিযোগ এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় তিনি ছিলেন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। প্রাণী সুরক্ষায় সরকারের কঠোর অবস্থান, কুকুর নিধন বন্ধে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি এবং তদন্তের নির্দেশে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এই অভিনেত্রী। সরকারের এই উদ্যোগকে তিনি প্রাণী কল্যাণের পথে একটি ‘বিগ স্টেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গোপালগঞ্জের ঘটনা ও জয়ার উদ্বেগ
অক্টোবর মাসে গোপালগঞ্জে নির্বিচারে কুকুর নিধনের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই ঘটনার কোনো যথাযথ ‘ইনভেস্টিগেশন’ বা তদন্ত হয়নি এতদিন। বিষয়টি নিয়ে জয়া আহসান সহ দেশের প্রাণিপ্রেমী সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। জয়া আহসান জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়শই এমন নির্মম প্রাণী হত্যার ঘটনা ঘটে, কিন্তু বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে তা থামানো যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টার কাছে একটি আনুষ্ঠানিক বা ‘অফিশিয়াল’ সরকারি নির্দেশনার জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছিল।
জোড়া প্রজ্ঞাপন: সরকারের কঠোর বার্তা
অবশেষে জয়া আহসান ও প্রাণিপ্রেমীদের সেই দাবি পূরণ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। জয়া আহসান এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘এই চিঠিটি বা অফিশিয়াল ডকুমেন্টটি সত্যিই খুব প্রয়োজন ছিল। এটি ইতিমধ্যেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে—যা আমাদের জন্য একটি বড় খবর।’’
জয়া জানান, সরকারের এই নির্দেশনায় দুটি মূল বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে: ১. সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও মানবিক ব্যবস্থাপনা: একটি প্রজ্ঞাপনে কুকুর নিধনের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে, কুকুর নিয়ন্ত্রণে নিষ্ঠুরতা পরিহার করে ‘হিউম্যান ম্যানেজমেন্ট’ বা মানবিক উপায় কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনাটি দেশের সকল সিটি করপোরেশনের মেয়র, জেলা প্রশাসক (DC), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO), পৌর মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে পাঠানো হয়েছে, যা তাদের মেনে চলতে বাধ্য করা হবে।
২. তদন্তের বাধ্যবাধকতা: অপর প্রজ্ঞাপনটি গোপালগঞ্জের কুকুর নিধনের ঘটনা কেন্দ্র করে। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ‘প্রোব রিপোর্ট’ বা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
জয়া আহসানের মতে, অতীতে প্রাণী হত্যার ঘটনায় সচরাচর কোনো তদন্ত বা বিচার হতো না। স্থানীয় প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিত না। কিন্তু নতুন এই নির্দেশনার ফলে জেলা প্রশাসকরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বাধ্য থাকবেন। ফলে প্রাণী হত্যার ঘটনাগুলো এখন একটি শক্ত ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ বা আইনি কাঠামোর মধ্যে আসবে, যা প্রাণীর অধিকার সুরক্ষাকে অনেক বেশি সহজতর করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ বা প্রাণিকল্যাণ সংগঠন মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে, কিন্তু প্রশাসনের সহায়তার অভাবে সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল মিলত না। সরকারের এই আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ এখন এনজিও এবং স্থানীয় প্রশাসনের (Local Administration) কাজকে আরও সমন্বিত করবে।’’
জয়া আশা প্রকাশ করেন, সরকারের এই নির্দেশনার ফলে অবলা প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা কমবে এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এখন প্রয়োজন শুধু মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনার সঠিক বাস্তবায়ন।