'পানির অপর নাম জীবন'—এই বহুল প্রচলিত বাক্যটিই এখন দেশের লাখ লাখ মানুষের জন্য 'বিপজ্জনক' হয়ে উঠেছে। একটি গভীর উদ্বেগজনক সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, পানির সব ধরনের উৎসের প্রায় অর্ধেক এবং প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ৮টি পরিবারে ব্যবহৃত পানির নমুনায় ভয়ংকর ই. কোলাই (E. Coli) ব্যাকটেরিয়া দূষণ রয়েছে।
ইউনিসেফের সহযোগিতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ই. কোলাই-এর আতঙ্ক
পানিতে এই মারাত্মক ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া দূষণ দেশের লাখ লাখ শিশুর জন্য ডায়রিয়া, টাইফয়েড (Typhoid) ইত্যাদি রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। সাধারণ এক গ্লাস পানিই তাদের জন্য ভয়ানক বিপদ বয়ে আনতে পারে।
মাত্র ৩৯.৩ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় পানি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক মানুষ রয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে।
অনিরাপদ পানির কারণে কলেরা, আমাশয়, হেপাটাইটিস, অ্যামিবিয়াসিস, কৃমির মতো রোগ বৃদ্ধি পায়; দেখা দেয় কিডনির সমস্যা, পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির মতো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বিশেষ করে বন্যাকবলিত অঞ্চল কিংবা আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় এই রোগগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করে।
পরিসংখ্যান বলছে, নিরাপদ পানির অভাবে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৮ থেকে ১৫ লাখ মানুষ পানিবাহিত রোগে মারা যায়, যার বেশিরভাগই শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, সারা বিশ্বের প্রায় ২২০ কোটি মানুষ সুরক্ষিত পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
দায় কার? সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
দেশের এত বিপুল সংখ্যক মানুষের পানির অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য দায়ী কে? বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত জাতীয় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা (National Water Resource Management) গড়ে তোলার যে প্রয়োজন ছিল, তা সম্ভব হয়নি।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা: এই ব্যর্থতার জন্য স্বয়ং রাষ্ট্র এবং বিভিন্ন সময় সরকারের দায়িত্ব পালনকারীরা দায়ী। একটি শক্তিশালী 'ওয়াটার গভর্ন্যান্স' (Water Governance) কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
জনসচেতনতার ঘাটতি: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে পানি দূষণমুক্ত করা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব রয়েছে।
আর্থিক সংগতি: অনেক প্রান্তিক মানুষের পানি বিশুদ্ধকরণের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার মতো আর্থিক সংগতি (Financial Capability) নেই।
করণীয়: বৃহৎ পরিসরে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি
এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বৃহৎ পরিসরে এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ জরুরি। প্রান্তিক অঞ্চল থেকে শুরু করে শহর-নগর পর্যন্ত অবকাঠামো উন্নয়ন (Infrastructure Development) সহ নিরাপদ পানির উৎস বাড়াতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে হলে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি:
সরকারকে পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং (Public Health Engineering) ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।
প্রান্তিক মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পানি বিশুদ্ধকরণের প্রযুক্তি (Water Purification Technology) সরবরাহ করতে হবে।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান (Enterprise Standard) নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমানের সংশ্লিষ্টরা এবং পরবর্তীকালে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন, তারা সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে আন্তরিক হবেন, কারণ এটি কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Economic Development) ও মানবসম্পদকে (Human Resource) নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত।