মাছে-ভাতে বাঙালি’—শাশ্বত এই প্রবাদটি শুধুই মুখের কথা নয়, বাঙালির দৈনন্দিন খাদ্যভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুপুরের খাবারে এক টুকরো মাছ না হলে যেন দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর সেই মাছ যদি হয় তেলে ভাজা বা ‘ডিপ ফ্রাই’ (Deep Fry), তবে তো কথাই নেই। কিন্তু রসনা তৃপ্তির এই অভ্যাসই শরীরের জন্য ডেকে আনছে চরম বিপর্যয়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত বা ডুবো তেলে ভাজা মাছ নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack), স্ট্রোক এবং হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: স্বাদ যখন শত্রুর
সুস্বাদু ভাজা মাছ খাওয়ার সময় আমরা অনেকেই ভুলে যাই এর স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে একাধিকবার বা নিয়মিত ভাজা মাছ খান, তাদের ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্র বিকল বা ‘হার্ট ফেইলিওর’ (Heart Failure)-এর আশঙ্কা প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এমনকি মাঝেমধ্যে খেলেও স্ট্রোকের (Stroke) ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছ ভাজার সময় উচ্চ তাপমাত্রায় তেলের রাসায়নিক গঠন বা ‘কেমিক্যাল স্ট্রাকচার’ ভেঙে যায়। বিশেষ করে বারবার ব্যবহার করা পোড়া তেল বা বনস্পতি (Vanaspati) দিয়ে ভাজলে তা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এটি শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের (Bad Cholesterol) মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ধমনীতে ব্লক তৈরির পথ সুগম করে।
মাছ কি তবে বাদ? আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ
ভাজা মাছ ক্ষতিকর মানেই খাদ্যতালিকা থেকে মাছ বাদ দেওয়া নয়। বরং মাছের সঠিক পুষ্টিগুণ পেতে রান্নার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। ‘আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন’ (American Heart Association)-এর ‘হাইপারটেনশন’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রায় ৪৯ হাজার নারীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একবার সঠিক উপায়ে রান্না করা মাছ খান, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি মাছ না খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ৫০ শতাংশ কম।
মাছে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড (Omega-3 Fatty Acid), যা হার্টের সুরক্ষায় অপরিহার্য। তাই মাছ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না, বন্ধ করতে হবে মাছের ভুল রান্না।
রান্নার পদ্ধতি: গ্রিল, বেক নাকি ফ্রাই?
বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিচ্ছেন, মাছের পূর্ণ পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ভাজা মাছের পরিবর্তে গ্রিল (Grill), বেকড (Baked) বা সেদ্ধ মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যদি ভাজা মাছ খেতেই হয়, তবে তা ‘শ্যালো ফ্রাই’ (Shallow Fry) বা অল্প তেলে ভাজতে হবে। ডুবো তেলে মাছ ভাজলে এর প্রোটিন ও ওমেগা-থ্রি নষ্ট হয়ে যায় এবং ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, টানা পাঁচ সপ্তাহ ভাজা মাছ এড়িয়ে গ্রিল বা আগুনে সেঁকা মাছ খেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করে খেলে তা ব্লাড প্রেসার, সুগার এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাদুর মতো কাজ করে।
কোন মাছ কতটা খাবেন?
‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ’-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক মোট ক্যালোরির অন্তত দুই শতাংশ ওমেগা-থ্রি থেকে আসা উচিত, যা গড়ে প্রায় ৪ গ্রাম। হৃদরোগ প্রতিরোধে কালচে রঙের বা তৈলাক্ত মাছ যেমন—স্যামন, ম্যাকারেল, টুনা বা ব্লু ফিশ অত্যন্ত কার্যকরী।
তবে বাঙালির পাতে রুই, কাতলা বা মৃগেল মাছও যথেষ্ট উপকারী, যদি তা সঠিক উপায়ে রান্না করা হয়। খুব বেশি দিন বরফে সংরক্ষিত বা ‘ফ্রোজেন’ (Frozen) মাছ এড়িয়ে তাজা মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। হার্টের সুরক্ষায় সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার ৩.৫ আউন্স পরিমাণ মাছ খাওয়া উচিত। মনে রাখবেন, মাছ আপনার বন্ধু, কিন্তু ভাজা মাছ হতে পারে আপনার নীরব ঘাতক।