রাজধানীর বিজয়নগরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে এক অনন্য সম্মানে ভূষিত করা হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারানো এই তরুণ নেতাকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলের পাশেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজা সম্পন্ন হবে।
পারিবারিক ইচ্ছা ও শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় ইনকিলাব মঞ্চের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এক বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, পরিবারের পক্ষ থেকে হাদিকে কবির পাশে সমাহিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছিল। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU) কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে নজরুল ইসলামের সমাধিস্থল সংলগ্ন এলাকায় দাফন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী শুক্রবারই মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও, বড় পরিসরে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতির জন্য তা পরিবর্তন করে শনিবার করা হয়েছে। শনিবার দুপুর ২টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে একটি শোক মিছিলের মাধ্যমে মরদেহ কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়ে যাওয়া হবে।
শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার কড়া বার্তা
বিবৃতিতে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ছাত্র-জনতার প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, "কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেন এই জানাজা ও শোক মিছিলকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে অনুপ্রবেশ (Infiltration) ঘটিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।" একইসঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সহিংসতার সুযোগ বন্ধ করতে আন্দোলনকারীদের অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে কর্মসূচি পালন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে মরদেহ সর্বসাধারণের দেখার (Public Viewing) সুযোগ থাকছে না।
মরণপণ লড়াই ও অন্তিম যাত্রা
শরীফ ওসমান হাদির এই অকাল প্রয়াণের নেপথ্যে রয়েছে এক নৃশংস হামলার ঘটনা। গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে গণসংযোগ চলাকালীন একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাকে লক্ষ্য করে ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়। বুলেটটি তার মাথায় বিদ্ধ হওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (DMCH) নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে এবং অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে (Air Ambulance) করে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ ছয় দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দেশে পৌঁছালো নিথর দেহ
শুক্রবার সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটে হাদির মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেট দিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সযোগে তার মরদেহ হিমাগারে (Mortuary) নিয়ে যাওয়া হয়। এই সময় বিমানবন্দরে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও নিকটাত্মীয়রা।
শরীফ ওসমান হাদির এই বিদায়ে দেশের ছাত্র রাজনীতি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় কবির পাশে তার শেষ শয্যা পাতিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে তার ত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের এক বিশেষ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন অনেকেই।