ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ওয়াশিংটনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের রণকৌশল এখন তুঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাগামী সব তেল ট্যাংকার (Oil Tanker) অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ক্যারিবীয় সাগর থেকে আরও একটি জাহাজ আটক করেছে মার্কিন বাহিনী। এই ঘটনা দক্ষিণ আমেরিকার রাজনৈতিক অস্থিরতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পেন্টাগনের ঝটিকা অভিযান ও ‘সেঞ্চুরিজ’ আটক
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) ভোরে পেন্টাগনের (Pentagon) সরাসরি নির্দেশনায় মার্কিন কোস্টগার্ড এই অভিযান পরিচালনা করে। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টের মাধ্যমে জাহাজ আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আটককৃত ‘সেঞ্চুরিজ’ নামক জাহাজটি মাদক সন্ত্রাসবাদে (Narcoterrorism) অর্থায়নের উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ তেল বহন করছিল।
প্রকাশিত আট মিনিটের একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, মার্কিন বিশেষ বাহিনী অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ‘সেঞ্চুরিজ’ জাহাজের ডেকে অবতরণ করছে। পানামার পতাকাবাহী এই জাহাজটি গত কয়েক বছর ধরে গ্রিস ও লাইবেরিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে চলাচল করলেও এটি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনুমোদিত তালিকায় ছিল না। চলতি মাসে এটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়া দ্বিতীয় ভেনেজুয়েলাভিত্তিক তেলবাহী জাহাজ।
মাদক সন্ত্রাসবাদ বনাম আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন ও ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ (International Piracy) হিসেবে অভিহিত করেছে ভেনেজুয়েলা। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এক কড়া বিবৃতিতে বলেন, “আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি বেসরকারি জাহাজ ছিনতাই করেছে এবং এর ক্রুদের জোরপূর্বক নিখোঁজ করা হয়েছে। এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি নগ্ন হস্তক্ষেপ।”
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে একটি ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ সরাসরি মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও সমালোচকদের মতে, এই দাবির সপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো নিরেট প্রমাণ জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে পারেনি।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে নজিরবিহীন সামরিক উপস্থিতি
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভেনেজুয়েলা উপকূলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলে একটি বিশাল বিমানবাহী রণতরি (Aircraft Carrier), ডজনখানেক যুদ্ধজাহাজ এবং কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন নৌযানে মার্কিন হামলায় প্রায় ১০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে খোদ মার্কিন কংগ্রেসের (US Congress) ভেতরেই এখন তদন্ত চলছে। প্রশ্ন উঠছে, মাদক নিয়ন্ত্রণের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র কি ল্যাটিন আমেরিকায় কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে?
‘শ্যাডো ফ্লিট’ ও নিষেধাজ্ঞার মারপ্যাঁচ
২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকেই বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখতে ভেনেজুয়েলা তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ (Shadow Fleet) বা ছায়া জাহাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এসব জাহাজ সাধারণত নিজেদের জিপিএস অবস্থান গোপন রাখে এবং পরিচয় বদল করে তেল পরিবহন করে।
ট্যাংকার ট্র্যাকার্স ডটকমের (TankerTrackers.com) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভেনেজুয়েলার জলসীমায় থাকা প্রায় ৮০টি জাহাজের মধ্যে ৩০টিরও বেশি জাহাজ আগে থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজগুলো ব্যবহার করে মাদুরো সরকার তাদের অর্থনীতির প্রধান উৎস তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে, যা এখন ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।