• দেশজুড়ে
  • ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড: মেলেনি ধর্ম অবমাননার প্রমাণ, গ্রেফতার কারখানার ইনচার্জসহ ১০

ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড: মেলেনি ধর্ম অবমাননার প্রমাণ, গ্রেফতার কারখানার ইনচার্জসহ ১০

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড: মেলেনি ধর্ম অবমাননার প্রমাণ, গ্রেফতার কারখানার ইনচার্জসহ ১০

মর্মান্তিক এই খুনের নেপথ্যে পূর্বশত্রুতা রয়েছে কি না খতিয়ে দেখছে র‍্যাব; মহাসড়ক অবরোধের পর থমথমে পরিবেশ কাটিয়ে তদন্তে বড় অগ্রগতি।

ময়মনসিংহের ভালুকায় যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে (২৮) গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার নারকীয় ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এনেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বাহিনীটি জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূলে যে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামলা দায়েরের পর গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-১৪।

র‍্যাবের চিরুনি অভিযান ও গ্রেফতার

শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুরে ময়মনসিংহে র‍্যাব-১৪’র সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার পর থেকে ছায়া তদন্ত শুরু করে র‍্যাব। শুক্রবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১০ অভিযুক্তকে আটক করা হয়।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ মো. আলমগীর হোসেন ও কোয়ালিটি ইনচার্জ মো. মিরাজ হোসেন আকন। এ ছাড়াও আটক করা হয়েছে কারখানার শ্রমিক মো. তারেক হোসেন, মো. লিমন সরকার, মো. মানিক মিয়া, এরশাদ আলী, নিঝুম উদ্দিন, আজমল হাসান সগীর, শাহিন মিয়া এবং নাজমুলকে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কি ভিত্তিহীন?

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব অধিনায়ক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ধর্ম অবমাননার বিষয়টি এখন পর্যন্ত অত্যন্ত অস্পষ্ট। দিপু চন্দ্র দাস ঠিক কী বলেছিলেন, তার সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট সাক্ষী বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমরা উপস্থিত শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা পাইনি।”

তিনি আরও যোগ করেন, দিপুর সঙ্গে কারো পূর্বশত্রুতা ছিল কি না অথবা এটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো উস্কানিদাতা এই গুজব ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করেছে কি না, সেটিও র‍্যাবের নজরদারিতে রয়েছে।

কারখানায় ঠিক কী ঘটেছিল?

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস কারখানার ফ্লোরে কাজ চলাকালীন দিপুর সঙ্গে অন্য কর্মীদের বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ দিপুকে তাৎক্ষণিক চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে সরাসরি উত্তেজিত জনতার হাতে হস্তান্তর করেন।

র‍্যাব অধিনায়ক প্রশ্ন তোলেন, “কারখানা কর্তৃপক্ষ কেন তাকে নিরাপত্তা দেয়নি বা কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেয়নি? এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই দেখেই কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।” সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage) বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে।

পটভূমি ও মামলার বর্তমান অবস্থা

গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে ‘ধর্ম অবমাননার’ গুজব ছড়িয়ে দিপু চন্দ্র দাসকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।

এই ঘটনায় গত শুক্রবার বিকেলে নিহতের ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ভালুকা মডেল থানায় ১৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। র‍্যাবের হাতে ১০ জন গ্রেফতার ছাড়াও পুলিশ আগে আরও ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। বর্তমানে মোট ১৩ জন এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শ্রীঘরে রয়েছেন।

পুলিশ ও র‍্যাব যৌথভাবে বাকি আসামিদের ধরতে তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে। দিপু দাসের এই মৃত্যু কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং ‘মব জাস্টিস’ (Mob Justice) বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়াবহ চিত্র হিসেবে দেখছেন সমাজচিন্তকরা।

Tags: bangladesh police law enforcement human rights mymensingh news rab operation criminal investigation mob lynching bhaluka murder dipu chandra factory worker