দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস ‘রেমিট্যান্স’ প্রবাহে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম ২০ দিনেই প্রবাসীরা ২১৭ কোটি ২১ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের (Bangladesh Bank) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের (Inward Remittance) এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।
দৈনিক গড় ও সাপ্তাহিক প্রবাহের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে মোট ২১৭ কোটি ২১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১০ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। সপ্তাহের ব্যবধানে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৪ থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৬৬ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এর আগে ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৮৭ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ডলার। মাসের প্রথম ছয় দিনে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৬৩ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
ব্যাংকিং চ্যানেলের চিত্র: বেসরকারি ব্যাংকের প্রাধান্য
বরাবরের মতোই দেশে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো (Private Commercial Banks)। প্রথম ২০ দিনে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৫৮ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩৭ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর (Specialized Banks) মাধ্যমে ২১ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৪২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।
ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও পূর্ববর্তী মাসের প্রেক্ষাপট
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে এক ধরনের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত নভেম্বর মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন, যা এখন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের সর্বোচ্চ। এছাড়া অক্টোবর মাসে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার আয় এসেছিল। আগস্ট ও জুলাই মাসেও প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ এবং ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
রেকর্ড গড়ার পথে প্রবাসী আয়
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিসেম্বরের শেষ দশ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে চলতি মাস শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে দেশে ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন (৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং প্রবাসীদের জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনামূলক উদ্যোগের ফলে দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়ছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (Forex Reserve) শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমদানির দায় মেটানো এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।