• ব্যবসায়
  • রেকর্ডের পর রেকর্ড: বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে নতুন ইতিহাস, আউন্সপ্রতি দর ৪৩০০ ডলার ছাড়াল

রেকর্ডের পর রেকর্ড: বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে নতুন ইতিহাস, আউন্সপ্রতি দর ৪৩০০ ডলার ছাড়াল

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
রেকর্ডের পর রেকর্ড: বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে নতুন ইতিহাস, আউন্সপ্রতি দর ৪৩০০ ডলার ছাড়াল

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর পূর্বাভাস এবং বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে ‘সেফ হেভেন’ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা তুঙ্গে; এক বছরে রুপার দাম বেড়েছে ১৩৮ শতাংশ।

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত স্বর্ণ ও রুপার দামে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক মহাকাব্য। মার্কিন ডলারের দরপতন এবং সুদের হার কমানোর ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশায় বিশ্ববাজারে এই মূল্যবান ধাতু দুটির দাম সব রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন শুরুর পর থেকেই গ্রাফের ঊর্ধ্বগতি বিশেষজ্ঞদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

আকাশছোঁয়া দর: স্বর্ণ ও রুপার বর্তমান অবস্থান

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে (Spot Market) স্বর্ণের দাম ১.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৯১.৯২ ডলারে পৌঁছেছে। এটি স্বর্ণের ইতিহাসে একক কোনো দিনে আউন্সপ্রতি সর্বোচ্চ দরের নতুন মাইলফলক।

স্বর্ণের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রুপাও দেখিয়েছে চমকপ্রদ পারফরম্যান্স। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ২.৭ শতাংশ লাফিয়ে প্রতি আউন্স ৬৯.২৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত বুলিয়ন (Bullion) বা স্বর্ণের বার-এর দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ, যা ১৯৭৯ সালের পর এক বছরে সর্বোচ্চ বার্ষিক মুনাফা বা ‘Annual Gain’ অর্জনের পথে রয়েছে। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে রুপার দাম গত এক বছরে ১৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এমনকি স্বর্ণের প্রবৃদ্ধির হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।

কেন এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি?

বাজার বিশ্লেষকরা এই ঐতিহাসিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. মার্কিন সুদের হার ও ফেড পলিসি: বিনিয়োগকারীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন যে, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (Federal Reserve) আগামী বছরে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে। সাধারণত সুদের হার কমলে বন্ডের চেয়ে স্বর্ণের মতো অ-ফলনশীল সম্পদে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক হয়।

২. নিরাপদ বিনিয়োগ বা Safe Haven: মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার বাজার থেকে সরিয়ে ‘সেফ হেভেন’ বা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয়ের প্রবণতাও বাজারে যোগান কমিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

৩. ডলারের দুর্বল অবস্থান: বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের মান কিছুটা নরম বা দুর্বল হওয়ায় বিদেশি মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ ও রুপা কেনা সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। ফলে ডিমান্ড (Demand) বৃদ্ধিতে এর দাম হু হু করে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

স্টোনএক্সের (StoneX) সিনিয়র বিশ্লেষক ম্যাট সিম্পসন বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, “ডিসেম্বর মাস ঐতিহাসিকভাবেই মূল্যবান ধাতুর বাজারের জন্য একটি ইতিবাচক সময়। এ মাসেই স্বর্ণের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে বছরের শেষ দিকে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সর্তক অবস্থান নিতে পারেন এবং অনেকে ‘প্রফিট বুকিং’ বা মুনাফা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, ২০২৬ সালে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের গতি ত্বরান্বিত হয় এবং ফেড সুদের হার আরও দুই দফা কমায়, তবে স্বর্ণের দামের এই জয়যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দাপট

স্বর্ণ-রুপার পাশাপাশি অন্য মূল্যবান ধাতুগুলোর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত প্ল্যাটিনামের দাম ৪.১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ২ হাজার ৫৪.২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া প্যালাডিয়ামের দাম ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৮১.৩২ ডলারে পৌঁছেছে, যা বিগত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে পণ্যের এই দাম বৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলবে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বাজারেও। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে স্বর্ণ ও রুপার গয়না এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্যের খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।

Tags: gold price economic crisis silver record global market fed rate precious metals investment news spot market bullion trading safe haven