রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে নজিরবিহীন হামলার ঘটনায় তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি বিশ্লেষণ করে এই পর্যন্ত ৩১ জন হামলাকারীকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে দেশজুড়ে পরিচালিত চিরুনি অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
বর্বরোচিত হামলার তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
নজরুল ইসলাম জানান, হামলায় জড়িতদের শনাক্তে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ ‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন’ ও ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ সংশ্লিষ্ট ধারাসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ আইনে মামলা দায়ের করেছে। অন্যদিকে দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে এবং তাদের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াটি বর্তমানে ‘প্রসেসিং’ পর্যায়ে রয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ডিএমপির থানা পুলিশ ১৩ জন, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিট ৩ জন এবং ডিবি (DB) বিভাগ ১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন রাখা এবং কোনো প্রকার প্রাণহানি না হতে দেওয়া। আমরা সফলভাবে বড় ধরনের রক্তপাত এড়াতে পেরেছি।"
লুটের টাকা দিয়ে বিলাসিতা: নাইমের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে অন্যতম মো. নাইম নামের এক যুবক। তাকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে লুণ্ঠিত ৫০ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাইম স্বীকার করেছেন, হামলার সময় তিনি অফিস থেকে মোট ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা লুট করেছিলেন। সেই টাকা দিয়ে তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে একটি নতুন টেলিভিশন ও একটি রেফ্রিজারেটর কেনেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেই টিভি ও ফ্রিজ উদ্ধার করেছে।
অপরাধী প্রোফাইল: উগ্রবাদ থেকে পেশাদার অপরাধী
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে গ্রেপ্তারকৃতদের বিচিত্র অপরাধমূলক ব্যাকগ্রাউন্ড। ১. রাকিব হোসেন: শেরপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এই যুবককে ভিডিও ফুটেজে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে সরাসরি অংশ নিতে দেখা গেছে। তিনি তার সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media) অ্যাকাউন্ট থেকে হামলার ছবি পোস্ট করে উস্কানি দিয়েছিলেন। ২. মো. সোহেল রানা: তেজগাঁও থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন আইনে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। ৩. মো. শফিকুল ইসলাম: কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অতীতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের একাধিক মামলা রয়েছে। ৪. কাশেম ফারুক: মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এবং বগুড়ার একটি মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র।
প্রধান উপদেষ্টার কঠোর হুঁশিয়ারি: জিরো টলারেন্স নীতি
এদিকে, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, গণমাধ্যম বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা ও সহিংসতাকে কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে এবং জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) বজায় রাখার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
হামলার নেপথ্যে ও প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, গত ১৮ ডিসেম্বর ‘ইনকিলাব মঞ্চে’র আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। উত্তেজিত জনতা কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। এই ঘটনায় চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনের কাছেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়, যার তিনজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, চিহ্নিত বাকি আসামিদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় এবং সাইবার স্পেসে উস্কানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।