• ক্যাম্পাস
  • শিক্ষায় 'বদলি চাঁদরাত': এক রাতে ৪৭৫ কর্মকর্তার রদবদল, বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

শিক্ষায় 'বদলি চাঁদরাত': এক রাতে ৪৭৫ কর্মকর্তার রদবদল, বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

নির্বাচন তপশিলের আগে এক রাতেই বদলির সব রেকর্ড ভেঙে নতুন নজির স্থাপন: শিক্ষা ক্যাডারের রদবদল ঘিরে শিক্ষা উপদেষ্টা, সচিবের দপ্তরসহ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ।

ক্যাম্পাস ১ মিনিট পড়া
শিক্ষায় 'বদলি চাঁদরাত': এক রাতে ৪৭৫ কর্মকর্তার রদবদল, বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিলের ঠিক আগে গত ১১ ডিসেম্বর রাতে শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন পদে রদবদলের যেন এক 'চাঁদরাত' পার হলো। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এদিন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন দপ্তর-প্রতিষ্ঠানের ৪৭৫ জন ক্যাডার কর্মকর্তার বদলি-পদায়ন করা হয়। নজিরবিহীন এই বদলি প্রক্রিয়ায় বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে শিক্ষা উপদেষ্টা, সচিবের দপ্তর এবং কলেজ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এক দিনে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনাকে অনেকেই 'বদলির চাঁদরাত' নামে আখ্যা দিয়েছেন।

নজিরবিহীন 'বদলি চাঁদরাত' ও সিন্ডিকেট তৎপরতা

গত ১১ ডিসেম্বর এক রাতেই ৪৭৫ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে বদলি করার ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে। শুধু বদলিই নয়, একই দিনে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে ২৭০৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি এবং ৯৪ জনকে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদে পদায়ন করা হয়। নির্বাচন তপশিলের পর বদলি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন অজুহাতে এক দিনে এত বিপুলসংখ্যক আদেশ জারি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির নেপথ্যে একটি বড় সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যারা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব রদবদল সম্পন্ন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের পিএস রকিবুল হাসান তার পছন্দের ১৩ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে বদলি-পদায়নের একটি 'বলয়' তৈরি করেছেন। এই বলয়ের অন্যতম সদস্য হলেন সরকারি কলেজ-২ শাখার উপসচিব তানিয়া ফেরদৌস। তিনি প্রায় দেড় মাস বদলির সব ফাইল আটকে রেখে ১১ ডিসেম্বর হঠাৎ করে সব ফাইল ছাড়ার তাগিদ দেন, যার সুযোগে পিএস পছন্দের ফাইলগুলো অনুমোদন করিয়ে নেন। পূর্বে দীপু মনির মেয়াদেও বদলি বাণিজ্যের বিস্তর অভিযোগ ছিল, যেখানে প্রশাসনিক পদে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ এবং ঢাকার কলেজে বদলিতে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতো বলে জানা যায়। তবে এবারের এক রাতের বদলি অতীতের সেসব অভিযোগকেও হার মানিয়েছে।

'ঘুষের রাজ্য' ডিআইএ-তে বিতর্কিত রদবদল

শিক্ষা প্রশাসনে 'ঘুষের রাজ্য' হিসেবে পরিচিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরকে (ডিআইএ) ঘিরে সবচেয়ে বেশি কেলেঙ্কারি হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বরের বদলিতে ডিআইএ থেকে পাঁচ কর্মকর্তাকে সরানো হলেও সহকারী পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা মিতুর বদলি আদেশ ২১ ডিসেম্বর বাতিল করে তাকে ডিআইএতেই রাখা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষা উপদেষ্টার দপ্তরের এক কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তার বদলি বাতিল করা হয়। এছাড়া একই দপ্তরের শিক্ষা কর্মকর্তা নূশরাত হাছনীন, যাকে অনেকে 'সায়লেন্ট লেডি' বা 'ঘুষের রানি' নামে চেনেন, তার বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নামে প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মকর্তার এক মাসের বেতন ঘুষ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

'চাঁদরাতের' বদলিতে ডিআইএ-তে নতুন পদায়ন হওয়া পাঁচ কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এদের মধ্যে এ. টি. এম আল ফাত্তাহ ও এফ এম শাহাবুদ্দীন রুমনের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ টি এম আল ফাত্তাহর বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও তাকে পদায়ন করা হয়, যদিও সমালোচনার মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত যোগদান করেননি।

সচিববিহীন সময়ের বদলি বাণিজ্য ও বিতর্কিত কর্মকর্তারা

সাবেক সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহারের পর এবং নতুন সচিব রেহেনা পারভীন যোগদানের মধ্যবর্তী সময়ে—এই সচিববিহীন এক মাসেই সবচেয়ে বেশি বদলি বাণিজ্য হয়েছে। এই সময়ে মন্ত্রণালয়ে সক্রিয় চার সিন্ডিকেট বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠনের সাবেক নেতাদেরসহ অনেক বিতর্কিত কর্মকর্তাকে লোভনীয় পদে বদলি করে। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ড. এনামুল হক, যিনি 'শতকোটির' এনামুল নামে পরিচিত। ১৩ বছরেরও বেশি সময় 'ঘুষের রাজ্য' ডিআইএতে কর্মরত থাকার পর মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তাকে রাজধানীর ঢাকা উদ্যান কলেজে পদায়ন করা হয়। সচিববিহীন এক মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন কলেজের অন্তত ৪৫ জন আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।

এছাড়াও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) আলোচিত উপপরিচালক (অর্থ) হাবিবুর রহমান, যিনি দীপু মনির 'ক্যাশিয়ার' হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাকে বদলি করা হলেও একটি সিন্ডিকেট তাকে সেখানে বহাল রাখতে তৎপর রয়েছে। ঘুষ কারবারে আলোচিত 'প' আদ্যাক্ষরের এক কর্মকর্তাসহ আরও ৩১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বদলি-পদায়নের বিপুল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কলেজ শাখার যুগ্ম সচিব খোদেজা খাতুন দাবি করেন, নানা ব্যস্ততার কারণে উপদেষ্টা ও সচিব বদলির ফাইলে স্বাক্ষর করতে না পারায় এক দিনে এতগুলো আদেশ জারি হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, শিক্ষায় ২২ হাজারের বেশি কর্মকর্তা আছেন এবং তাদের নিয়মিত বদলি করা একটি রুটিন কাজ। তবে বদলি ঘিরে কোনো বাণিজ্য হলে, তা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

Tags: bangladesh corruption bribery education transfer ministry of education bcs cadre dia