যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দিগঙ্গা কুচলিয়া হরিদাসকাটি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তার চিত্রটি এখন যেকোনো সচেতন নাগরিকের জন্য চরম বিস্ময়কর। যেখানে রাতের আঁধারে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব এক নৈশ প্রহরীর, সেখানে পাহারার গুরুদায়িত্ব পালন করছে একদল ‘বেওয়ারিশ কুকুর’। অন্যদিকে, নির্ধারিত প্রহরী পলাশ বিশ্বাস কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেই গত তিন বছর ধরে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব আর প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার যোগসাজশে চলা এই ‘ঘোস্ট এমপ্লয়ি’ (Ghost Employee) কালচার মণিরামপুরের শিক্ষা প্রশাসনে এক বড় ধরনের ‘সিস্টেমিক ফেইলর’ (Systemic Failure) হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
পাহারায় কুকুর, আড্ডায় প্রহরী: এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই পলাশ বিশ্বাসের কার্যকলাপে চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও জবাবদিহিতার (Accountability) অভাব লক্ষ্য করা গেছে। গত ১৮ এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে সরজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরো ক্যাম্পাস অন্ধকার ও জনমানবহীন। প্রহরীর কক্ষে কোনো চিহ্ন নেই, বরং বিদ্যালয়ের বারান্দায় অবাধ বিচরণ করছে কুকুর। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, পলাশ রাতভর কুচলিয়া নতুন বাজারে চায়ের আড্ডায় মজে থাকেন। এমনকি পরিস্থিতি এমন যে, তিনি মাঝে মাঝে নিজের বাবাকে ফোন করে স্কুলে গিয়ে স্রেফ একটি বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে আসার অনুরোধ করেন, যেন বাইরে থেকে মনে হয় কেউ ভেতরে আছে। অথচ তিনি নিজে ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বাজারে সময় কাটান।
সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিতর্কিত ভূমিকা ও ফাঁস হওয়া ফোনালাপ
এই নজিরবিহীন অনিয়মের নেপথ্যে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মানস মুকুল বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়ে গভীর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পলাশ বিশ্বাসের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান পৃষ্ঠপোষক তিনি। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং উল্টো সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনৈতিক অনুরোধ করেন। এমনকি একটি ফোনালাপে পলাশ বিশ্বাসকে পাশে বসিয়ে তাঁকে সুকৌশলে উত্তর শিখিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ‘ডিজিটাল এভিডেন্স’ (Digital Evidence) হিসেবে সামনে এসেছে। দায়িত্বশীল পদে থেকে একজন নৈশ প্রহরীর এই চূড়ান্ত অবহেলাকে প্রশ্রয় দেওয়ার ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘বিচারের ঊর্ধ্বে’ থাকার মানসিকতা
স্থানীয়দের দাবি, পলাশ বিশ্বাস রাজনৈতিক প্রভাব এবং ‘অদৃশ্য খুঁটির জোর’ থাকায় কাউকেই তোয়াক্কা করেন না। সাধারণ গ্রামবাসী তাঁকে বারবার সতর্ক করলেও তিনি কোনো কর্ণপাত করেননি। উল্টো প্রহরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন, “আমি ডিউটি দেব কি দেব না, তা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। পত্রিকায় লেখালেখি হলে ফল ভালো হবে না।” সরাসরি সংবাদকর্মীকে হুমকি দেওয়ার এই ঘটনাটি তাঁর ‘ইমপিউনিটি’ (Impunity) বা বিচারের ঊর্ধ্বে থাকার মানসিকতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
সাবেক সভাপতির উদ্বেগ ও প্রশাসনিক নীরবতা
বিদ্যালয়ের সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রাহুল রায় বলেন, “স্কুলটি একটি নির্জন এলাকায় অবস্থিত। রাতে পাহারা না দিলে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। পলাশ বিশ্বাসের এই অবহেলার কথা আমি লোকমুখে শুনেছি, যা অত্যন্ত উদ্বেগের।” এদিকে প্রধান শিক্ষক মলয় কান্তি এই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ‘ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ততা’র অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন, যা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি ও আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষা
মণিরামপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এম সাইফুল ইসলাম এই ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “চাকরিবিধি (Service Rules) অনুযায়ী নৈশ প্রহরীকে অবশ্যই রাতে বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা (Legal Action) নেব।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্রাট হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে ম্যানেজিং কমিটির নতুন প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় থাকলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে পলাশ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হরিদাসকাটি এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানে খোদ শিক্ষকরাই দুর্নীতির ঢাল হয়ে দাঁড়ান, সেখানে সরকারি সম্পদের সুরক্ষা দেবে কে?