ভারতের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU) চত্বরে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবিকে ইউনিয়ন হাই স্কুলের (ABK Union High School) শিক্ষক রাও দানিশ আলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এমন দুঃসাহসিক শ্যুটআউটের ঘটনায় ক্যাম্পাস জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও দুষ্কৃতীদের হুঁশিয়ারি
নিহত দানিশ আলি ওই স্কুলের কম্পিউটার সায়েন্স (Computer Science) বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিটে তিনি দুই সহকর্মীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। তারা যখন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন একটি স্কুটারে করে দুই বন্দুকধারী সেখানে হাজির হয়।
গুলি চালানোর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে এক ঘাতক দানিশকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলে, ‘তুমি আমাকে এখনও চিনতে পারোনি, এবার চিনবে।’ এরপরই তাকে লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি গুলি চালানো হয়। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ (Point-blank range) থেকে চালানো একটি গুলি সরাসরি দানিশের মাথায় লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন তিনি।
হাসপাতালে মৃত্যু ও প্রশাসনিক তৎপরতা
আশঙ্কাজনক অবস্থায় দানিশ আলিকে দ্রুত জওহরলাল নেহেরু মেডিকেল কলেজে (Jawaharlal Nehru Medical College) নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ ওয়াসিম আলি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং অনভিপ্রেত। দানিশের মাথায় গুরুত্বর ক্ষত ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। আলিগড় পুলিশ ইতোমধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুরো এলাকা কর্ডন (Cordon) করেছে এবং ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV footage) নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগি আদিত্যনাথ রাজ্যের ‘Law and Order’ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতির দাবি করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মুখ্যমন্ত্রীর দাবিকে ঘিরে বিরোধী শিবিরের সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুষ্কৃতীদের প্রবেশ এবং প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড রাজ্যের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও উদ্বেগ
এই হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গগুলো সামনে আসছে। গত ৫ ডিসেম্বর বিহারের ফেরিওয়ালা মুহাম্মদ আতহারকে উগ্রবাদী জনতার নির্মম পিটুনির শিকার হতে হয়েছিল, যিনি গত ১২ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সম্মানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষিত যুবকের এমন অকাল মৃত্যু ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আবারও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। নিহতের পরিবার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন কেবলই শোক আর চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।